অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: বাংলাদেশের নদীকূটনীতিতে নতুন সন্ধিক্ষণ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। ফলে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, পরিবেশ সুরক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় সামনে এসেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু বিদ্যমান চুক্তি নবায়নের বিষয় নয়; বরং পরিবর্তিত জলবায়ু ও নদীর প্রবাহের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরির সুযোগও।

বাংলাদেশ সরকার পুরোনো চুক্তি শুধু নবায়নের পরিবর্তে নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পানি বণ্টনে বাংলাদেশের প্রাপ্য হিস্যা নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ক্লজ বা নিশ্চয়তামূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা চলার কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ। সূত্র: বাসস

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রয়োজন সুস্পষ্ট কূটনৈতিক প্রস্তুতি, হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

১৯৯৬ সালের চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ফারাক্কা ব্যারাজ। ১৯৭৫ সালে ব্যারাজটি চালু হওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ভাটির অংশে পানির প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, লবণাক্ততা ও সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ঘিরে।

স্বাধীনতার পর পানি বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা ও সমঝোতার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দুই দেশ ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার প্রাপ্য প্রবাহ ভাগ করার কাঠামো নির্ধারণ করে। সূত্র: বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশন

চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমের পানিবণ্টনের একটি আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে। তবে সময়ের সঙ্গে নদীর প্রবাহ, জনসংখ্যা, পানির চাহিদা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির পরিবর্তন হওয়ায় বিদ্যমান কাঠামো কতটা কার্যকর, তা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গঙ্গার পানি বণ্টনের বর্তমান সূত্র কী

১৯৯৬ সালের চুক্তির সংযোজনী অনুযায়ী, ফারাক্কায় গঙ্গার পানির প্রাপ্য প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়।

  • ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম প্রবাহ হলে: দুই দেশ সমান ভাগে পানি পাবে।

  • ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক প্রবাহ হলে: বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক; ভারত পাবে অবশিষ্ট পানি।

  • ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি প্রবাহ হলে: ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক; বাংলাদেশ পাবে অবশিষ্ট পানি।

এ ছাড়া চুক্তিতে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিক দশ দিন মেয়াদে দুই দেশের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তার বিধান রয়েছে। সূত্র: চুক্তির পাঠ ও যৌথ নদী কমিশন

এই সূত্র ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতের পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা, শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা এবং পরিবেশগত প্রয়োজনের আলোকে এর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা জরুরি।

কেন ২০২৬ সালের আলোচনা আগের চেয়ে আলাদা

১৯৯৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের পর তিন দশকে নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ও পানির চাহিদার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তাই নতুন চুক্তির আলোচনায় কেবল অতীতের প্রবাহের হিসাব নয়, ভবিষ্যতের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা

গঙ্গা অববাহিকার পানিপ্রবাহ বর্ষা, তাপমাত্রা, হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ, ভূগর্ভস্থ পানি এবং ভূমি ব্যবহারের মতো নানা বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময়, খরার তীব্রতা এবং বন্যার ঝুঁকিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এ অবস্থায় অতীতের গড় প্রবাহের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের পানিবণ্টন নির্ধারণ করলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। তাই হালনাগাদ জলবৈজ্ঞানিক তথ্য, নিয়মিত প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনাকে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সূত্র: ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স

শুধু পানির পরিমাণ নয়, নদীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ

নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কত পানি কোন দেশ পাবে, সেই প্রশ্নটি সামনে আসে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনায় আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন—কোন সময়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে, পানির গুণগত মান কেমন, নদীর নাব্যতা বজায় থাকছে কি না এবং জলজ প্রাণী ও পরিবেশের জন্য পর্যাপ্ত প্রবাহ নিশ্চিত হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে মিঠা পানির প্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। তাই নতুন কাঠামোয় পানির ন্যায্য বণ্টনের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রয়োজন ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থাও গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের নদীকূটনীতিতে কী প্রস্তুতি প্রয়োজন

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ কার্যকরভাবে তুলে ধরতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, গঙ্গার প্রবাহ, শুষ্ক মৌসুমের পানির চাহিদা, কৃষি ও পরিবেশগত প্রয়োজন নিয়ে হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, চুক্তিতে পানির ন্যূনতম প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার মতো বিধান নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা, পানির দক্ষ ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তসীমান্ত চুক্তি একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না; এর সুফল পেতে দেশের ভেতরেও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

সামনে কূটনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ সময়

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ ও ভারতের আলোচনায় সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই দেশের জন্যই এমন একটি সমঝোতা প্রয়োজন, যা পানির ন্যায্য ব্যবহার, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু পুরোনো চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নয়; বরং ভবিষ্যতের পানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানভিত্তিক, জলবায়ু-সহনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা। প্রস্তুতি, তথ্যনির্ভর আলোচনা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাই এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফ্রান্সের প্রধান কোচ হচ্ছেন বিশ্বকাপজয়ী জিদান

1

বিএনপির মনোনয়ন পেলেন আওয়ামী লীগ নেত্রীর মেয়ে

2

ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকে কোনো চুক্তি হয়নি, হতাশ ইউক্রেন

3

চোটে অনিশ্চিত নেইমার, পরিবারে আসছে নতুন সন্তান

4

পদত্যাগ করলেন মেসিদের কোচ মাচেরানো

5

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংখ্যা প্রায় ১১.৮৯ লাখ

6

আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার

7

নিষিদ্ধই থাকছে আ.লীগের কার্যক্রম, সংসদে বিল পাস

8

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৭টায়

9

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু

10

ইয়েমেনে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা,

11

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সংরক্ষিত নারী আসন: বিএনপি ৩৬, জামায়াত জো

12

আয়োজকরা চায় আমরা বাদ পড়ি : ফিফা সভাপতিকে ইরান অধিনায়ক

13

ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের সতর্কবার্তা দিলো ভারতীয় হাইকমিশন

14

৬২ বছরে প্রথম শিল্পকলায় একক কনসার্ট রুনা লায়লার, পেলেন সম্

15

‘মহানগর ২’ ছাড়ার কারণ জানালেন ইমরান

16

যিনি ফিলিস্তিনিদের কষ্ট অনুভব করেন না, তিনি মানুষ নন: মিসরের

17

রোনালদো–নেইমার–মদ্রিচের পর, এবার কি মেসির পালা?

18

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে শিশুসহ নিহত ৩

19

জাপানে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প

20