
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জনসমর্থন কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সেই মনোভাবের তেমন পরিবর্তন হয়নি। অনেক ভোটার মনে করছেন, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে পারেনি।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, খুব অল্পসংখ্যক মার্কিন ভোটার বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে বা করতে পারবে। বরং অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সংঘাতটি দেশের জন্য ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি ফেলেছে। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন ও অসন্তোষ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসমর্থনের এই ঘাটতি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। যুদ্ধের কারণে যদি রিপাবলিকান পার্টির জনপ্রিয়তা কমে যায়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনৈতিক প্রভাব। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচে পড়ছে। ফলে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি এখন অনেক মার্কিন নাগরিকের জন্য অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের বড় অংশ মনে করেন, যুদ্ধের কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে এটি নির্বাচনী রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যে এই অভিযান প্রয়োজনীয় ছিল এবং দুই পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের স্থায়ী অবসান কিংবা বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। অতীতে বড় সামরিক অভিযানের আগে মার্কিন প্রশাসন সাধারণ জনগণের কাছে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেও, এবার তেমন কোনো বিস্তৃত প্রচারণা দেখা যায়নি। ফলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও ফলাফল নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প দীর্ঘদিন নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছেন। তাই বর্তমান সংঘাত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে, যা ভোটারদের একাংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্তিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হলো—এই সংঘাত কত দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোবে এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত কতটা চড়া হবে। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টির ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।