
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
দীর্ঘ সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে গিয়ে শি জিনপিং দুই দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক স্বার্থ রক্ষায় যৌথভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি কিম জং উনকে আশ্বস্ত করেন যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধুমাত্র বন্ধুত্বের বার্তা নয়; বরং উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠতা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়াকে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে পিয়ংইয়ং আর্থিক সুবিধা এবং সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনের জন্যও কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বেইজিং কোনোভাবেই চায় না উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হোক। কারণ এতে কিম জং উনের ওপর চীনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কমে যেতে পারে। তাই শি জিনপিংয়ের এই সফরকে অনেকেই চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
চীনের দৃষ্টিতে উত্তর কোরিয়া এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা এবং পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বেইজিং পিয়ংইয়ংকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে এই সম্পর্কের মধ্যেও কিছু জটিলতা রয়েছে। চীন উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন করলেও দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অতিরিক্ত সম্প্রসারণ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বেইজিং আশঙ্কা করে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা জোট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার জন্যও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্য আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চীনের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার চাহিদা কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য কিম জং উনকে আবারও চীনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ কৌশলগত ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।