
দেশের চোরাচালান কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। সমুদ্রবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি চোরাকারবারিরা গড়ে তুলেছে সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মামলা ও গ্রেপ্তার বাড়লেও তদন্তের বেশিরভাগই সীমাবদ্ধ থাকছে বাহক বা বহনকারীদের মধ্যে। ফলে চোরাচালান চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় চোরাচালান আইনে মোট ১ হাজার ৯৫০টি মামলা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, চার বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই মামলা হয়েছে ১৫৫টি। এর আগে ২০২৫ সালে ৪৪৫টি, ২০২৪ সালে ৩২০টি, ২০২৩ সালে ৪৪৪টি, ২০২২ সালে ৩৯৮টি এবং ২০২১ সালে ১৮৮টি মামলা রেকর্ড করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালান এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যফেরত প্রবাসীদের অনেক সময় বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারি চক্র। বিভিন্ন অভিযানে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ভেতর, বিমানের আসনের নিচে কিংবা টয়লেটে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার হচ্ছেন বাহকরা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে।
অন্যদিকে সমুদ্রপথেও চলছে নানা ধরনের চোরাচালান। মিস-ডিক্লারেশন বা ভুল ঘোষণার মাধ্যমে বিদেশি মদ, সিগারেট, প্রসাধনী, উচ্চমূল্যের কাপড় এবং ইলেকট্রনিক পণ্য দেশে আনা হচ্ছে। কাগজপত্রে ‘পোলট্রি ফিড’, ‘স্ক্র্যাপ’ কিংবা ‘মেশিনারি’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলেও কনটেইনারে পাওয়া যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কিছু অসাধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কাস্টমস কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোও চোরাচালানের বড় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করছে ভারতীয় চিনি, মসলা, প্রসাধনী, শাড়ি-কাপড়, ফেনসিডিল এবং গবাদিপশুর চালান। পাহাড়ি ভূখণ্ড ও ঘন অরণ্যের কারণে এসব এলাকায় নজরদারি কঠিন হওয়ায় চোরাকারবারিরা সহজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে।
মামলার চার্জশিট বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামির তালিকায় থাকে শুধু বাহক বা পরিবহনকারীদের নাম। অথচ কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগে পরিচালিত চোরাচালান সিন্ডিকেটের গডফাদারদের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে খুব কমই উঠে আসে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এবং সীমান্তভিত্তিক চোরাকারবারিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এই অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, চোরাকারবারিরা বর্তমানে ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে কাজ করায় অনেক সময় বাহকরাও চালানের প্রকৃত প্রেরক ও প্রাপকের তথ্য জানেন না। ফলে কিছু মামলায় প্রাথমিকভাবে বহনকারীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হলেও পরবর্তীতে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে অতিরিক্ত আসামি যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, চোরাচালান প্রতিরোধে ব্যাপক অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তার দাবি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতার কারণেই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে এবং চোরাচালান শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে কাজ চলছে।