
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত ভবনটিতে হামলার পর সীমিত পরিসরে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরামকোর একটি সূত্রের দাবি, ধাহরানে কোম্পানিটির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভবনটির ওপরের তিনটি তলায় আঘাত লাগে। সূত্রটি ও এ বিষয়ে অবগত আরও দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। তবে হামলার কারণে ভবনটির সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরামকোর এ কমপ্লেক্সটি কোম্পানিটির কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে স্থল ও সমুদ্রজুড়ে বিস্তৃত তেল উত্তোলনকেন্দ্র, পাইপলাইন, পরিশোধনাগার এবং রপ্তানি টার্মিনালের বড় নেটওয়ার্ক তদারকি করা হয়। ফলে এ স্থাপনায় হামলার ঘটনা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরামকোর কমপ্লেক্সের আশপাশে থাকা ছয়টি সূত্র জানিয়েছে, তারা সেখানে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, ধাহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। পরে ক্ষেপণাস্ত্রটির ধ্বংসাবশেষ একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানায়নি জোটটি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে রিয়াদে চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু রয়েছে। এ ছাড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতে রাজধানীর ১৫টি বাড়ি সীমিত মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার জবাবে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল হুথি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে। এর মধ্যে ধাহরানে সৌদি আরামকোর সদর দপ্তর এবং রিয়াদের একটি তেল পরিশোধনাগারের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
হুথিরা সৌদি আরবে কর্মরত তেলশিল্পের শ্রমিকদেরও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো থেকে দূরে থাকার সতর্কতা দিয়েছিল। ফলে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা তাদের আগের হুমকির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে হামলার দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
হুথি পরিচালিত আল-মাসিরা টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশনে হামলা চালিয়েছে। এর আগে হুথিরা অভিযোগ করেছিল, সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হামলা চালাচ্ছে। একই দিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শহরটির উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি জ্বালানি তেলের ডিপোর আশপাশে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক করে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য হুথিদের হুমকি সৃষ্টির সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যেই ওই স্টেশনসহ কয়েকটি স্থাপনায় অভিযান চালানো হয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা ও বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে সৌদি আরব। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর দ্রুত অগ্রসর হয়ে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে রিয়াদ অভিযান জোরদার করে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দেশটির মন্ত্রিসভার বৈঠকেও হুথিদের হামলার বিষয়টি উঠে আসে। আরামকোর ভবনে হামলার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরবে বারবার হামলার জন্য হুথিদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সৌদি সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত বাব আল-মানদেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ নৌপথের ভূমিকা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে সৌদি আরব মিত্রদের কাছ থেকে আরও সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে দেশটির দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য সৌদি আরবের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে বলে গত রোববার জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পরদিন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও এ প্রস্তাবের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। তবে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার পর সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা কোন দিকে এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনার কাছাকাছি হামলা এবং একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।