
বিদেশ ভ্রমণে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বার্ষিক সীমা ১২ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে অনুমোদিত অর্থ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ভ্রমণসংক্রান্ত খরচে সেই অর্থ ব্যবহার করতে না পারলে সীমা বাড়ানোর সুফল অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সময় এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন এক ভ্রমণকারী। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক কার্ডে অনলাইন লেনদেনের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজের টিকিট কেনা থেকে শুরু করে স্থানীয় পরিবহনের ভাড়া পরিশোধেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাঁকে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য নিজের, স্ত্রী ও সন্তানের উড়োজাহাজের টিকিট কিনতে চেয়েছিলেন ওই ভ্রমণকারী। খরচ কমাতে অন্যদের মতো তিনিও বিভিন্ন বিকল্প খুঁজছিলেন। কিন্তু তিনজনের টিকিটের মোট মূল্য ৩০০ ডলারের বেশি হওয়ায় অনলাইনে লেনদেনটি সম্পন্ন করতে পারেননি বলে জানান তিনি।
তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক কার্ডে অনলাইন লেনদেনের নির্ধারিত সীমার কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়। অথচ ব্যয়টি তাঁর অনুমোদিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার মধ্যেই ছিল। ফলে বৈধভাবে অনুমোদিত অর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় একটি সাধারণ খরচ মেটানো সম্ভব হয়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ১২টার দিকে মেয়েকে নিয়ে পৌঁছানোর পর পরিবহন নিয়েও সমস্যায় পড়েন ওই ভ্রমণকারী। তাঁর সামনে বিকল্প ছিল বিমানবন্দরের তুলনামূলক ব্যয়বহুল ট্যাক্সি অথবা উবারের মতো অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা।
কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে ইস্যু করা কার্ড দিয়ে উবারের ভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি বলে জানান তিনি। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত সন্তানকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত বেশি ভাড়ার ট্যাক্সি নিতে হয়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এতে উবারে যাতায়াতের সম্ভাব্য খরচের দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় হয়।
পরদিন নিউইয়র্কে বসবাসরত এক বন্ধুর সহায়তা নেন তিনি। বন্ধুর ক্রেডিট কার্ড নিজের উবার অ্যাকাউন্টে যুক্ত করার ব্যবস্থা করেন, যাতে পরবর্তী সময়ে পরিবহন ভাড়া পরিশোধ করা যায়।
এ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি এবং পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ যাতায়াতের খরচ মেটাতে কেন অন্যের বিদেশি কার্ডের ওপর নির্ভর করতে হবে?
আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু উড়োজাহাজের টিকিট কেনার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ওই ভ্রমণকারী। তবে তাঁর মতে, ভ্রমণকারীরা সব সময় সরাসরি এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কেনেন না।
কম দামে টিকিট পেতে অনেকেই ট্রিপ ডটকমের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন কিংবা স্কাইস্ক্যানারের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার ভাড়া তুলনা করেন। একইভাবে হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও বুকিং ডটকম ও আগোডার মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে সাশ্রয়ী বিকল্প পাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু এসব মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্মে পেমেন্ট করতে সমস্যা হলে ভ্রমণকারীরা কম খরচের সুযোগ হারাতে পারেন। সরাসরি কোনো সেবাদাতাকে অর্থ পরিশোধের অনুমতি থাকলেও বিকল্প প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের বাধা শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখা এবং মুদ্রার অপব্যবহার ঠেকানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ওই ভ্রমণকারী।
তাঁর যুক্তি, ব্যাংকগুলো প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে। আর্থিক ও করসংক্রান্ত ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ও বাড়ছে। তাই নিয়মিত ও বৈধ ভ্রমণ ব্যয় আটকে না দিয়েও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত এবং তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে বৈধ খরচ মেটাতে বারবার ব্যর্থ হলে ভ্রমণকারীরা বেশি নগদ অর্থ সঙ্গে রাখতে কিংবা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে পেমেন্টের বিকল্প খুঁজতে পারেন। এতে আর্থিক লেনদেনের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিদেশ ভ্রমণের খরচ সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কয়েকটি পরিবর্তনের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন ওই ভ্রমণকারী। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক কার্ডে একক লেনদেনের সীমা যৌক্তিক পর্যায়ে বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকৃত ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য সুস্পষ্ট ছাড়ের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
প্রস্তাবিত ছাড়ের আওতায় বিদেশে অবস্থানকালে কেনা অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজের টিকিট, স্বীকৃত হোটেল বুকিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ পরিশোধ, অ্যাপভিত্তিক পরিবহন, ট্রেনের টিকিট এবং গাড়ি ভাড়ার মতো খরচ রাখা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য অভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। কোনো সেবাদাতাকে সরাসরি উড়োজাহাজ সংস্থা বা হোটেল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ না করে মধ্যস্থতাকারী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত করার কারণে যেন বৈধ লেনদেন আটকে না যায়, তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিদেশ ভ্রমণে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা ১৮ হাজার ডলারে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি। তবে সেই অর্থ বৈধ ও শনাক্তযোগ্য ভ্রমণ ব্যয়ে ব্যবহার করার বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
টিকিট বুকিং, হোটেল সংরক্ষণ কিংবা গভীর রাতে বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় কাজে আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করতে না পারলে ভ্রমণকারীদের বাড়তি ব্যয় ও ভোগান্তি পোহাতে হয়।
তাই বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি বৈধ ভ্রমণ ব্যয় সহজ করার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন। অনুমোদিত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানো গেলে ভ্রমণকারীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়তে পারে।