
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, ২০৩০ সালে তাঁর বর্তমান প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে। সংবিধান পরিবর্তন করে ক্ষমতায় থাকার সময় বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। শনিবার (১৭ অক্টোবর) মিসরের সামরিক একাডেমিতে এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন ৭১ বছর বয়সী সিসি।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালেই তাঁর প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে এবং বিষয়টি চূড়ান্ত। মিসরের সংবিধান পরিবর্তন করা হবে না বলেও জানান তিনি।
তবে সিসির এই ঘোষণার অর্থ এখনই তাঁর পদত্যাগ নয়। বরং বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে ক্ষমতা ছাড়ার প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন তিনি। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও তাঁর বক্তব্যকে ২০৩০ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার ঘোষণা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ক্ষমতা ছাড়ার সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিলেও মিসরের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন সিসি। তিনি বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্য মানুষ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তিনি মিসরকে ছেড়ে যাবেন না।
সামরিক একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর ঘোষণায় ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কী হবে এবং এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
২০১৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। মুরসি ছিলেন মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ২০১৪ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন সিসি।
এরপর থেকে দেশটির রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব বজায় রয়েছে। ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা হয়। ওই সংশোধনীর ফলে সিসির বর্তমান মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
সিসির সমর্থকেরা তাঁর নেতৃত্বকে স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর সরকারের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক নীতি ও বিরোধী মতের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সিসির শাসনামলে মিসরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও অন্যান্য সমালোচকদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রাক্কলনে মিসরে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা কয়েক দশ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বন্দির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, তাঁদের মধ্যে নারীর সংখ্যা এবং কারাগারে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
কারাগারে চিকিৎসার অভাব, অমানবিক পরিবেশ এবং বন্দিদের প্রতি দুর্ব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সিসির বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি ২০৩০ সালে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং সংবিধান পরিবর্তন করে মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা নাকচ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে ২০৩০ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং দেশটির সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর। আপাতত সিসির ঘোষণা তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।