
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষের জেরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।
ইউরোপের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা। কারণ, বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেক যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে। সেখানে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা, পণ্য কেনার প্রবণতা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক পরিবর্তন এলে বাংলাদেশের রফতানিও চাপে পড়তে পারে।
তবে ইউরোপের অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা আমদানি চাহিদাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, ইউরোপের পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশ গেছে ইইউভুক্ত দেশগুলোয়। এ সময়ে বাজারটিতে রফতানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কম।
ইইউর বড় বাজারগুলোর মধ্যে জার্মানিতে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ, স্পেনে ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ, ফ্রান্সে ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং ইতালিতে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ গেছে।
বছরওয়ারি হিসাবে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার আগেই বাংলাদেশের রফতানি নিম্নমুখী ছিল।
তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলোয় ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি।
এ সময়ে স্পেনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক ০২ শতাংশ, পোল্যান্ডে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং সুইডেনে ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ফ্রান্সে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ, ইতালিতে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং জার্মানিতে ০ দশমিক ১৫ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক রফতানি বাড়লেও ইইউর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পর্যটকরা গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। অস্থিরতার কারণে পর্যটন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য বিক্রিতে প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে এবং ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে তৈরি পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এমএস ডায়িং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশিদও অর্ডার কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব তাঁরা অনুভব করছেন। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমানে তাঁদের কাছে অর্ডার কম রয়েছে। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের সাম্প্রতিক অস্থিরতার আগেই বাজারে মন্দার কারণে ক্রয়াদেশ কমে গিয়েছিল।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্ডার কমে যাওয়ার পেছনে বর্তমান অস্থিরতার সুনির্দিষ্ট প্রভাব কতটা, তা এখনই আলাদা করে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রফতানি খাতে সংকট আরও বাড়তে পারে।
ইউরোপভিত্তিক বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়কৌশলেও পরিবর্তন আসছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স ও প্রাইমার্কের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশের একটি অংশ ভারত, মিসরসহ অন্যান্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।
ক্রেতারা একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন ও পণ্য সংগ্রহের উৎসে বৈচিত্র্য আনছেন। এ ক্ষেত্রে পণ্যের দাম, সরবরাহের সময় এবং উৎপাদন ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রফতানিকারকদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদায় মন্থরতা ও ক্রেতাদের ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ভারতসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোয় উৎপাদন ব্যয় ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সুবিধার সম্ভাবনাও ক্রয়াদেশ বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউরোপের অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচেম) চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ইউরোপের অস্থিরতা বাংলাদেশের রফতানিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বজুড়েই ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিভিন্ন দেশে আসন্ন নির্বাচন, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে চাপ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
নুরিয়া লোপেজের মতে, বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, শ্রম অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে বিরোধ এবং ব্যবসার পরিবেশে স্থিতিশীলতার অভাব। বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের কাছে স্থিতিশীলতার স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, রফতানি কার্যক্রমের নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে ভারতের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তুলাভিত্তিক পোশাকের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউর দেশগুলোয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে।
একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৪৫ লাখ ইউরো থেকে কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ আট মাসে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানি হ্রাসের হার অনেক বেশি। এ প্রবণতা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের রফতানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হবে। এমনিতেই ইউরোপের বাজারে বিক্রি কমেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির অবনতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, ইউরোপের অস্থিরতার প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ওপর পড়বে না; ইইউতে পোশাক রফতানিকারী অন্যান্য দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা ও দাম বাড়ার সম্ভাবনাও পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ ও চলমান অস্থিরতা বিবেচনায় নিলে সামনের দিনগুলোয় ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বাজারের ঘনত্বের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ইইউর বাইরে বাংলাদেশের বড় কোনো রফতানি বাজার গড়ে ওঠেনি।
তবে ইউরোপের অস্থিরতাকে সরাসরি বাজার সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তাঁর মতে, এ ধরনের অস্থিরতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। কোনো দেশে অস্থিরতা দেখা দিলেই যে আমদানি কমবে, তা নিশ্চিত নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা কোন দিকে যাবে, আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। ব্যবসা-বাণিজ্যে এ ধরনের সংকট আসতে পারে, তাই রফতানিকারকদের সেগুলো মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের অস্থিরতা বাংলাদেশের পোশাক রফতানির জন্য একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে পরিস্থিতির স্থায়িত্ব, ইউরোপীয় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতার ওপর।