
লক্ষ্মীপুরে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দরপত্র নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এক মাসে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে ঘুস দাবির অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। কাউকে সাময়িক বরখাস্ত, কাউকে স্ট্যান্ড রিলিজ, আবার কাউকে বদলি করা হয়েছে।
জেলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পৌরসভা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) কর্মকর্তাদের ঘিরে এসব ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ঘুস দাবির অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, বকেয়া বিল ও মালামালসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের বিনিময়ে এক ঠিকাদারের কাছে বড় অঙ্কের ঘুস দাবি করেছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাঁকে ‘২ কোটি টাকার নিচে নেব না’ বলতে শোনা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে পিডিবি।
ঘটনাটি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুলফিকার হোসেনকে তলব করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরপর তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে খাগড়াছড়িতে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় বলে জানা গেছে।
প্রকল্পের কাজের মান, ব্যয় এবং অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
লক্ষ্মীপুরের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তারের বিরুদ্ধে বিনামূল্যে ৯ হাজার ৩৮৯টি টুইন-পিট ল্যাট্রিন বিতরণ এবং ৫৬ কোটি টাকার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধিবিষয়ক (ওয়াশ) প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ওয়াশব্লক নির্মাণের কাজেও অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গাজীপুরে দায়িত্ব পালনের সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে তাঁকেও লক্ষ্মীপুর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে কমলনগর ও রামগতি উপজেলাকে রক্ষায় তীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কাজের গতি ও মান নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কাজের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খানকে বদলি করা হয়। এরপর নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিস হায়দার খান দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
বর্তমানে দপ্তরটিতে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. নুরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে দায়িত্বে পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়ন কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শ্রাবনী চক্রবর্ত্তীর বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজে সরকারি দরপত্রের নিয়ম উপেক্ষা করে সিলড কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এ নিয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। পরে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে দরপত্রপ্রক্রিয়ায় নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ঘিরে একের পর এক অভিযোগ ও দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) লক্ষ্মীপুরের সভাপতি মো. কামাল হোসেনসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা মনে করেন, শুধু বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনকালে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন, সেগুলোর নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্পের ব্যয়, নির্মাণকাজের মান, দরপত্রপ্রক্রিয়া এবং বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে কর্মকর্তাদের বদলি হলেও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।