
গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া শামোন্ডা ভাইরাস প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গত ২২ অক্টোবর এ তথ্য জানায়। আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল ছিল। অক্টোবরের শুরুর দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে ভাইরাসটির সংক্রমণেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য এ ভাইরাসের কারণে কোনো জনস্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হয়নি।
ফ্রান্সের লিঁও শহরে গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ওই ব্যক্তি। তাঁর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল থাকায় সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি ছিল।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ধারণা, পূর্ব ফ্রান্সে অবস্থানকালে রক্তচোষা ক্ষুদ্র পতঙ্গের কামড়ে তিনি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। ওই অঞ্চলে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে প্রাণীদের মধ্যে শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা। কয়েক দশক ধরে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভাইরাসটির উপস্থিতি থাকলেও এর আগে মানুষের শরীরে সংক্রমণের কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
শামোন্ডা ভাইরাস এক ধরনের অর্থোবুনিয়াভাইরাস। এটি মূলত গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ভাইরাসটি সাধারণত Culicoides গোত্রের অতি ক্ষুদ্র কামড়ানো পতঙ্গের মাধ্যমে ছড়ায়।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি নাইজেরিয়ায় প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। পরে পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি জাপানেও গবাদিপশুর মধ্যে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে প্রথমবারের মতো ইউরোপের গবাদিপশুর খামারগুলোতে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। ফ্রান্সসহ ইউরোপের একাধিক দেশে প্রাণীদের মধ্যে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এত দিন ভাইরাসটিকে মানুষের সংক্রমণের কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
আক্রান্ত ব্যক্তি অক্টোবরের শুরুতে মারা গেলেও তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর মৃত্যুর আগে দেখা দেওয়া মস্তিষ্কের জটিলতাগুলো শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া আর মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে ভাইরাসকে নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। এ বিষয়ে আরও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ও মহামারিবিদ্যাগত তদন্ত প্রয়োজন।
কীভাবে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে এবং এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা—তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য শামোন্ডা ভাইরাসের কোনো শনাক্ত জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। এখন পর্যন্ত এটিই প্রথম নথিভুক্ত মানব সংক্রমণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতরভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাহীন ছিলেন।
তবে একটি ঘটনা শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে মানুষের সংক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়। ভাইরাসটির মানবদেহে সংক্রমণ, প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলকে (ইসিডিসি) বিষয়টি জানিয়েছে। মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
শামোন্ডা ভাইরাসের এই প্রথম মানব সংক্রমণ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখছে না ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।