
ইরান সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে গেছে কয়েক ডজন ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। এই অভিযানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরাইলি গণমাধ্যম চ্যানেল-১২ জানিয়েছে, ইরানকে সামরিক প্রতিক্রিয়ায় উসকে দেওয়ার কৌশলও এই অভিযানের পেছনে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়। এতে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ইসরাইলি বিমানবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও অংশ নেয়।
চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমা অতিক্রম করে ইরান সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছায়। পরে কোনো হামলা না চালিয়েই সেগুলো ইসরাইলে ফিরে আসে।
মার্কিন সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলের লক্ষ্য সম্ভবত ছিল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। এমনকি ইরানি বাহিনী বিমানগুলো লক্ষ্য করে গুলি চালালে সেটিকে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এটি ইসরাইলের নিশ্চিত উদ্দেশ্য ছিল—এমন কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা অভিযানটিকে ‘প্রতিরোধমূলক মহড়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে জানিয়েছে চ্যানেল-১২। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ইসরাইল নিজের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং ইরানকে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রাখার বার্তা দিতে চেয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল আগে থেকেই ওয়াশিংটনকে এই অভিযানের বিষয়ে জানিয়েছিল। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে যুদ্ধবিমানগুলোর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারবে, সে বিষয়েও ইসরাইল সচেতন ছিল বলে দাবি করেছে মার্কিন সূত্রগুলো।
তবে এ ধরনের সামরিক তৎপরতায় ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি থাকে। ইরান যদি বিমানগুলোর উপস্থিতিকে আসন্ন হামলার প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করত, তাহলে পাল্টা পদক্ষেপ থেকে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারত।
এদিকে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত তিন ব্যক্তির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সম্ভাব্য অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিরোধিতা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে পরিকল্পিত হামলা বাতিল করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই সামরিক তৎপরতার সময় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরাইল সফরে ছিলেন। সফরের অংশ হিসেবে তিনি ওভদা বিমান ঘাঁটিতে নেতানিয়াহু ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এই সময়ের মধ্যে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের ইরান সীমান্তের কাছে যাওয়া এবং নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ—দুটি ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এই পরিস্থিতিতে ইরান সীমান্তের কাছে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের সাম্প্রতিক অভিযানকে শুধু সামরিক মহড়া হিসেবে দেখা হবে, নাকি এটি ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রস্তুতির অংশ—তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমনটি নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য এখনো এসব প্রতিবেদনে নেই। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে ইসরাইল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।