
ইবাদত-বন্দেগিতে পরিপূর্ণ জীবন কাটানোর পরও মানুষের অধিকার নষ্ট করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হক বা মানুষের অধিকার রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ, পাওনা আটকে রাখা, অপবাদ দেওয়া কিংবা অন্যভাবে জুলুম করার বিষয়গুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জাহান্নামের ওপর স্থাপিত সেতু পার হওয়ার পর মুমিনদের জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থানে থামানো হবে। সেখানে দুনিয়ায় তাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অধিকারহরণের নিষ্পত্তি হবে। এরপর তারা পবিত্র হলে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি পাবে। (সহিহ বুখারি: ২৪৪০)।
হাদিসে বর্ণিত ‘কানতারা’ বলতে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি সেতু বা পারাপারের স্থান বোঝানো হয়েছে। সেখানে দুনিয়ায় মুমিনদের মধ্যে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও জুলুমের প্রতিকার করা হবে।
বিষয়টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অধিকার নষ্ট করা শুধু দুনিয়ার সামাজিক বা আইনি সমস্যা নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে এর পরকালীন জবাবদিহিও রয়েছে।
ব্যবসায় কাউকে ঠকানো, ভাইবোনের সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়া, কর্মচারীর বেতন আটকে রাখা, ঋণ পরিশোধ না করা কিংবা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কারও সম্মানহানি করা—এসব অন্যায়ের বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে এমন একজনের কথা বলেছেন, যিনি কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাতের মতো ইবাদত নিয়ে হাজির হবেন। কিন্তু দুনিয়ায় তিনি কাউকে গালি দিয়েছেন, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছেন, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করেছেন কিংবা কারও ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন।
হাদিসে বলা হয়েছে, এসব অন্যায়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তাঁর নেকি থেকে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে পাওনাদারদের গুনাহ তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
পবিত্র কোরআনে মাপে কম দেওয়া ও মানুষের প্রাপ্য অধিকার খর্ব করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো নেয়, আর যখন মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।”
— সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩।
অন্যদিকে, সূরা ইবরাহিমের ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে জালিমদের অবকাশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে যে, তিনি তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গাফেল নন।
এসব আয়াতের শিক্ষা হলো, মানুষের অধিকার নষ্ট করে সাময়িক লাভবান হলেও অন্যায়ের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. পাওনা ও ঋণ পরিশোধ করুন: কারও অর্থ আটকে রাখলে বা অন্যায়ভাবে নিয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিন। সম্ভব হলে সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টির সমাধান করুন।
২. উত্তরাধিকারীদের অধিকার নিশ্চিত করুন: কেউ মারা গেলে তাঁর পাওনা অর্থ বা সম্পদের অধিকার যথাযথভাবে তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
৩. ক্ষমা চান ও অন্যায় সংশোধন করুন: কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান এবং ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পূরণ করার চেষ্টা করুন।
৪. পাওনাদারকে খুঁজে না পেলে পরামর্শ নিন: যথাসাধ্য চেষ্টা করেও পাওনাদার বা তাঁর উত্তরাধিকারীদের সন্ধান না পেলে কীভাবে পাওনা নিষ্পত্তি করা উচিত, সে বিষয়ে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন। নিজের সিদ্ধান্তে অর্থ দান করে দিলেই সব ক্ষেত্রে দায় শেষ হয়ে যায়—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
৫. গিবত ও অপবাদ থেকে বিরত থাকুন: কারও অনুপস্থিতিতে তাঁর এমন দোষ আলোচনা করা, যা তিনি অপছন্দ করবেন, গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মিথ্যা অপবাদ আরও গুরুতর অন্যায়। এসবের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার কীভাবে যথাযথভাবে সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে জ্ঞানী আলেমের পরামর্শ নিন।
মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই মানুষের পাওনা, ঋণ, সম্পত্তির অধিকার এবং ব্যক্তিগত বিরোধ ঝুলিয়ে না রেখে জীবদ্দশাতেই সেগুলো মীমাংসার চেষ্টা করা উচিত।
ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; ন্যায়বিচার, সততা, আমানতদারি এবং মানুষের অধিকার রক্ষার শিক্ষাও দেয়। তাই জান্নাতের প্রত্যাশা নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে হলে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি বান্দার হকের প্রতিও যত্নবান হওয়া জরুরি।