
বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৩০.২ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫১.৯ শতাংশ।
দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১.৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। গবেষকেরা পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের এলাকা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন।
শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সিসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে। এর প্রভাবে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ক্ষতির তাৎক্ষণিক লক্ষণ থাকে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে। অর্থাৎ, এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা গবেষণায় ব্যবহৃত সীমায় বা তার ওপরে।
গবেষণাটির শিরোনাম Social Patterning of Elevated Blood Lead Among Children Aged 12–59 Months in Bangladesh: A National Cross-Sectional Analysis of MICS 2025। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান গবেষণাটি করেছেন। চলতি মাসের ১৪ তারিখে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে এটি প্রকাশিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।
১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর ডব্লিউএইচওর উদ্যোগে পালিত হচ্ছে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’।
গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে পাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল—ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এ জরিপে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
মিকসের এ প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি। জরিপে আগে থেকে সংগ্রহ করা রক্ত পরীক্ষার ফলাফল ও পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য ব্যবহার করে তাঁরা পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করেছেন।
জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে করা মূল বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর।
প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকলে গবেষণায় সেটিকে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ধনী পরিবারের শিশুরা প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে। এ ছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র বেশি থাকতে পারে। এসব পণ্যে সিসা থাকলে সেগুলোর সংস্পর্শে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে গবেষণায় প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব বা দেয়ালের রংকে আলাদাভাবে সিসার উৎস হিসেবে পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে এসব পণ্যকে চিহ্নিত করা যায় না।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তাঁর মতে, এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা বেশি পেতে পারে। বাসায় সাজসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রীও থাকে। এ ছাড়া পোলট্রির মুরগির খাবারে সিসা থাকলে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও তা প্রবেশ করতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য উৎসের ভূমিকা নিশ্চিত করতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে।
সিসার সংস্পর্শে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা, শেখার সমস্যা ও আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব শিক্ষাগত অর্জনেও পড়তে পারে। সিসার সংস্পর্শ রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, সিসার কারণে শিশুর ক্ষতি হয়েছে কি না, তা শুধু বাহ্যিক চেহারা বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না। উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে তুলনামূলক কম মাত্রার সংস্পর্শেও শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করতে পারে এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যেতে পারে।
অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে। তবে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এসব সমস্যার বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা যায় না।
বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি এবং তাদের বিকাশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে।
২০১৬ সালে Environmental Health সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০ থেকে ৪০ মাস বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মোটর বিকাশ মূল্যায়ন করা হয়েছিল।
গবেষণায় সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। ওই এলাকায় রক্তে সিসার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরীক্ষায় কম স্কোর পাওয়ার সম্পর্কও দেখা যায়।
তবে এ ধরনের গবেষণায় দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটি অন্যটির একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
২০২০ সালে Journal of Neurodevelopmental Disorders সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ৭৩৪ শিশুকে নিয়ে আরেকটি গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়।
এতে অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণার সব ক্ষেত্রে এ সম্পর্ক একই রকম ছিল না। গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি বা খর্বাকৃতি শিশুদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার ক্ষেত্রে বিভাগভেদেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালের মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫.২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে।
বিভাগভিত্তিক হারগুলো হলো:
ঢাকা: ৬৫.২ শতাংশ
সিলেট: ৪৬.৭ শতাংশ
চট্টগ্রাম: ৪২.১ শতাংশ
ময়মনসিংহ: ৩০.৬ শতাংশ
বরিশাল: ২৯ শতাংশ
রংপুর: ১৯.৬ শতাংশ
খুলনা: ১৭.৮ শতাংশ
রাজশাহী: ১৫.৯ শতাংশ
গবেষকদের সমন্বিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিভাগভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরে বিশ্লেষণে ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে তুলনামূলক কম সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে কেন কোনো কোনো এলাকায় শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি, তা নির্ধারণ করতে সিসার সম্ভাব্য উৎস, পরিবেশগত পরিস্থিতি ও শিশুদের দৈনন্দিন সংস্পর্শ নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
গবেষণার ফলাফল শিশুদের সিসার সংস্পর্শের সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বিশেষ করে খাবার, খেলনা, রং, আসবাব ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যে সিসার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজর দেওয়া জরুরি।
শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া যাওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি শিশুর শরীরে একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে কোনো মাত্রাকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না বলে সিসার সংস্পর্শ কমানো জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
গবেষকদের মতে, জাতীয় জরিপের উপাত্তে ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিসার সম্ভাব্য উৎসগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।