
স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথ এল ক্লাসিকোয় আবারও মুখোমুখি হচ্ছে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। তারকাখচিত দুই দলের লড়াইয়ে এবার বিশেষ আকর্ষণ লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১৩ বছর পর এই মহারণে ফিরছেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনহো। বার্সেলোনার বিপক্ষে তাঁর প্রত্যাবর্তন পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যোগ করেছে নতুন উত্তেজনা।
২০১০ সালের নভেম্বরে বার্সেলোনার মাঠে মরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদকে ৫-০ গোলে হারিয়েছিল পেপ গার্দিওলার দল। এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে সেই ম্যাচ এখনো অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। বার্সেলোনার সমর্থকদের কাছে এটি আনন্দের স্মৃতি হলেও রিয়ালের সমর্থকদের জন্য ছিল হতাশার।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং সংঘাতও দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আলোচনায় রেখেছে। এবার সেই পরিচিত মঞ্চে মরিনহোর প্রত্যাবর্তন ম্যাচটির উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে।
বার্সেলোনার সামনে লিগে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার সুযোগ। অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের লক্ষ্য ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে নতুন গতি আনা।
লা লিগায় নিজেদের প্রথম নয়টি ম্যাচেই জিতেছে বার্সেলোনা। এসব ম্যাচে ৩৯ গোল করে তারা পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ছয় পয়েন্টে এগিয়ে কাতালানরা।
এই ম্যাচে বার্সেলোনা জিতলে দুই দলের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে নয় পয়েন্টে। অন্যদিকে, রিয়াল জিতলে ব্যবধান কমে হবে তিন পয়েন্ট। ফলে ম্যাচটির ফল শিরোপার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে আরবি লাইপজিগকে হারানোর পর ম্যাচটির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন মরিনহো। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম মুভিস্টারকে তিনি বলেছেন, এটি লিগের আরেকটি ম্যাচ হলেও অন্য ম্যাচগুলোর মতো নয়।
রিয়াল মাদ্রিদের সাম্প্রতিক এল ক্লাসিকো রেকর্ডও দলটির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ সাতটি দ্বৈরথের ছয়টিতেই হেরেছে তারা। সেই ধারায় ছেদ টেনে শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইবে মরিনহোর দল।
বার্সেলোনার কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে দলটি এল ক্লাসিকোয় ভালো পারফরম্যান্স করে আসছে। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) কাছে ৪-২ গোলে হেরে মৌসুমের প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে তারা।
এর আগে গেতাফে, গালাতাসারাই ও রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবলে নজর কেড়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু প্যারিসে রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং আক্রমণে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে দলটিকে।
চোটের কারণে রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এরিক গার্সিয়া ও জুলস কুন্দেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে বার্সেলোনা। পাশাপাশি মিডফিল্ডার দানি ওলমোর অ্যাডাক্টর পেশির চোটও কোচের কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ভালো ছন্দে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়নস লিগে লাইপজিগকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে তারা। তবে ঘরোয়া লিগে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রিয়ালের আক্রমণে আরদা গুলেরের পাস দেওয়ার দক্ষতা, জুড বেলিংহামের গতিশীলতা এবং এমবাপ্পের গতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে পারলে সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবেন ফরাসি তারকা।
বার্সেলোনার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিপক্ষের প্রেসিং ভেঙে বল নিয়ে সামনে এগোনো। চাপ কাটিয়ে এমন খেলোয়াড়ের কাছে বল পৌঁছাতে হবে, যিনি দ্রুত সামনে পাস দিতে পারবেন। তবেই বার্সেলোনার রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গায় দৌড়ানোর সুযোগ পাবেন এমবাপ্পে।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের পাসদাতার ওপর চাপ ধরে রাখা বার্সেলোনার জন্য জরুরি। রক্ষণভাগ অতিরিক্ত পেছনে সরে গেলে খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে। এতে বল পুনরুদ্ধার করে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার পরিচিত কৌশল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাইটব্যাক হিসেবে ফেদেরিকো ভালভার্দের ব্যবহারও রিয়ালের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তাঁর ওভারল্যাপিং দৌড় এবং ভেতরে ঢুকে খেলা সতীর্থদের সমন্বয় বার্সেলোনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে মাঝমাঠে সৃজনশীলতা ও রক্ষণাত্মক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ম্যাচের আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও ইয়ামাল ও এমবাপ্পে সরাসরি খুব বেশি মুখোমুখি হবেন না। বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণে তাঁরা কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারেন, সেটিই হবে তাঁদের প্রভাবের বড় মাপকাঠি।
বার্সেলোনার ডান প্রান্তে ইয়ামালের ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলতে পারে। তাঁকে আটকাতে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় এগিয়ে এলে অন্য জায়গায় ফাঁকা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন পেদ্রি ও আক্রমণভাগের অন্য খেলোয়াড়েরা।
অন্যদিকে, রাফিনিয়ার গতিশীল অবস্থান এবং বল ছাড়া দৌড় প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখবে। লিগে তাঁর গোলসংখ্যাও বলে দেয়, বার্সেলোনার আক্রমণ শুধু ইয়ামালনির্ভর নয়।
ইয়ামালকে কেবল তাঁর সরাসরি প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল নিয়ে এগোতে বাধা দিলেই চলবে না। তাঁকে আটকাতে গিয়ে রিয়ালের রক্ষণে অন্য কোনো খেলোয়াড়কে ফাঁকা ছেড়ে দিলে বিপদ বাড়তে পারে।
এদিকে, এমবাপ্পের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর গতি ও গোল করার দক্ষতা। বার্সেলোনার রক্ষণভাগ উঁচুতে উঠে খেললে সেই পেছনের জায়গা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন তিনি।
প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লিগে নয়টি ম্যাচে ইয়ামালের গোল আটটি এবং অ্যাসিস্ট ছয়টি। একই সংখ্যক ম্যাচে এমবাপ্পের গোল নয়টি, অ্যাসিস্ট দুটি। ফলে একজন যেখানে ড্রিবলিং ও সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরিতে কার্যকর, অন্যজন সেখানে গোল করার ক্ষেত্রে বড় হুমকি।
এল ক্লাসিকো শুধু দুই দলের মর্যাদার লড়াই নয়, লা লিগার শিরোপার সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বার্সেলোনা জিতলে শীর্ষে তাদের অবস্থান আরও শক্ত হবে। অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের জয় ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াইকে নতুন করে জমিয়ে তুলতে পারে।
ইয়ামালের সামনে রয়েছে বার্সেলোনার দুর্দান্ত লিগ-শুরুর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সুযোগ। এমবাপ্পের জন্য এটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখানোর পাশাপাশি রিয়ালকে শিরোপার লড়াইয়ে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়ার মঞ্চ।
মরিনহোর প্রত্যাবর্তন, দুই দলের সাম্প্রতিক ফর্ম, চোটের সমস্যা এবং ইয়ামাল-এমবাপ্পের দ্বৈরথ—সব মিলিয়ে এবারের এল ক্লাসিকো ঘিরে উত্তেজনার কমতি নেই। পয়েন্টের ব্যবধান আরও বাড়বে, নাকি কমে জমে উঠবে শিরোপার লড়াই, তার উত্তর দেবে মাঠের পারফরম্যান্স।