জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনায় ‘ভুল’ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন । তবে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত সভায় ফিফার শীর্ষ নির্বাহীদের সমর্থন পাওয়ায় সংস্থাটির সভাপতি হিসেবে বহাল থাকছেন তিনি।
পরিকল্পনাটি বাতিলের পরও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন ইনফান্তিনো। এরপর ফিফার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের জরুরি সভায় ডাকেন তিনি। গতকাল মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকান কার্যালয়ে সেই সভা শেষ হওয়ার চার ঘণ্টা পর ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থা।
ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম ও উপস্থিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বিবৃতিতে বলেন, ‘ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের ভোটে নির্বাচিত একমাত্র অফিসিয়াল হিসেবে সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।’
বিতর্কিত প্রস্তাবটি যেভাবে সামলানো হয়েছে, তা নিয়ে ফিফার ভেতর থেকেই চাপ বাড়ছিল ইনফান্তিনোর ওপর। গত শনিবার প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়ার পর তাঁর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়।
রাবাতের সভায় উপস্থিত ছিলেন ফিফার মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম। গত মঙ্গলবার কর্মীদের কাছে পাঠানো অভ্যন্তরীণ স্মারকে তিনি লেখেন, পুরো বিষয়টি ‘একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাক্রম’। তবে বৈঠক শেষে দেওয়া বিবৃতিতে গ্রাফস্ট্রোম ও পরিচালনা পর্ষদ ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর ওপর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
বিবিসি জানিয়েছে, ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম যৌথভাবে ফিফার সহসভাপতি, কাউন্সিল ও ২১১টি সদস্যদেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাছে একটি স্বাক্ষর করা চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে নিজেদের ভুলের জন্য তাঁরা ‘আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা’ করেন এবং ‘ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটার’ অঙ্গীকার জানান।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, দাবি ওয়েঙ্গারের
সভা শেষে রাবাতে মেয়েদের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের একটি ম্যাচ একসঙ্গে দেখেন ইনফান্তিনো ও গ্রাফস্ট্রোম। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা। শুরু থেকেই ইনফান্তিনোর পাশে থাকা হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তার একজন এই লেকজা। তিনি পরিকল্পনাটি বাতিল করার সিদ্ধান্তকে ‘বিজ্ঞোচিত’ বলে প্রশংসা করেন এবং ১০ বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ইনফান্তিনোর অবদানের প্রতি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এতে সায় দিলে প্রতিটি সদস্য–অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি ডলার দেওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এ পরিকল্পনা প্রকাশের পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা ও কনক্যাকাফ কড়া বিবৃতি প্রকাশ করে। তাদের প্রতি সমর্থন জানায় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। পাশাপাশি বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় উয়েফার অধিভুক্ত ৫৫টি দেশ।
ফিফা জানিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে এফএফই সম্পর্কিত ‘ভুলত্রুটি স্বীকার’ করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ফিফা কাউন্সিল ও সদস্যদেশগুলোকে এই ‘প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা’র ইচ্ছা তাঁদের ছিল না এবং ‘বিষয়টি ভিন্নভাবে সামলানো উচিত ছিল’।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ‘সংবাদমাধ্যমে প্রস্তাবটি ফাঁস হওয়ার পর যে ভুলগুলো হয়েছিল, সেসব মেনে নেওয়া হয়েছে।’ গত ২৮ জুলাই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস প্রথম ইনফান্তিনোর এই গোপন পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করে।
বিবৃতিতে ফিফা এটাও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, সংস্থাটির ‘ভাবমূর্তি, সুশাসন ও নিয়মকানুন নিয়ে কোনো আক্রমণ আর বরদাশত করা হবে না এবং নিজেদের সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে দ্য টাইমসে প্রকাশিত একটি খবর ভিত্তিহীন দাবি করে ফিফা জানায়, মরক্কোর সমর্থন পাওয়ার বিনিময়ে তাদের ২০৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আয়োজক বানানোর কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ফিফা এ দাবিকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এ টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে সিদ্ধান্ত ‘যথাসময়ে’ নেওয়া হবে।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো নিশ্চয়ই আশা করছেন, ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ১০ বছরের মেয়াদে সবচেয়ে বড় বিতর্কের অবসান হয়তো ঘটবে। তবে ফিফার বড় কর্মকর্তাদের সমর্থনের পরও তীব্র সমালোচনা এড়াতে পারছেন না ইনফান্তিনো।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, ইনফান্তিনোর ওপর তাঁর কোনো আস্থা নেই। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগালের সাবেক উইঙ্গার লুইস ফিগো ইনফান্তিনোকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিগো বলেন, ‘ইনফান্তিনো যে পদটির মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকেই তিনি অবনমিত করেছেন। তাঁর সম্মান বাঁচানোর সময় পার হয়ে গেছে, তবে ফুটবলকে বাঁচানোর সময় এখনো আছে।’
ইনফান্তিনোকে সরাতে ফিফাকে ‘অচল’ করার ছক বিরোধীদের
তবে এত কিছুর পরও ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি হিসেবে চতুর্থ মেয়াদের পুনর্নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত বলে মনে করা হচ্ছে।
মরক্কোয় ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে চাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত নাম জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ নির্বাচনে জয়ী হতে ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের মধ্যে ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্থাটি এর আগে জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা নেই এবং ফিফার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ওয়েলসসহ একাধিক সদস্যদেশ ইনফান্তিনোর প্রতি পুনর্নির্বাচনে দেওয়া সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
ফিফা অবশ্য দাবি করেছে, ‘ভুলত্রুটি হলেও যা করা হয়েছে, তা ফিফার বিদ্যমান নিয়মনীতির আলোকেই করা হয়েছে।’ সংস্থাটির আশা, এ বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো ‘ফিফার সুশাসনকে শক্তিশালী করবে এবং সংস্থার প্রতি আবার আস্থা ফিরিয়ে আনবে’।