ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এবার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজির বাজার গড়ে উঠতে যাচ্ছে। আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারির পূর্বাভাস অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে বিশ্বব্যাপী ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বাজি ধরা হতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজির পরিমাণের নতুন রেকর্ড গড়বে।
ম্যাককোয়ারির তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজি ধরা হতে পারে। তুলনামূলকভাবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মোট বাজির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এবারের আসরে বাজির বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজির পরিমাণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা। এর ফলে টুর্নামেন্টে ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে ১০০-এর বেশি হয়েছে, যেখানে কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচ ছিল ৬৪টি। দীর্ঘ ছয় সপ্তাহের এই আসর বাজি ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সময়সূচি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শকদের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দর্শকদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজির বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রে ক্রীড়াভিত্তিক বৈধ জুয়ার বাজার দ্রুত সম্প্রসারণও এই প্রবৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বৈধভাবে ক্রীড়া বাজিতে অংশ নিতে পারেন, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। ফলে এটি এমন একটি বিশ্বকাপ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক আইনগতভাবে বাজিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে ম্যাককোয়ারির বিশ্লেষক চ্যাড বেনিয়ন সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে জুয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন গ্রাহকদের নিয়মিত ব্যবহারকারীতে পরিণত করতে পারে কি না তার ওপর। তার মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্যাসিনো সুবিধা রয়েছে, তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
অন্যদিকে জুয়া-বিরোধী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে উদ্বেগের চোখে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা, আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
শিকারি জুয়া বন্ধ আন্দোলনের জাতীয় পরিচালক লেস বার্নালের দাবি, ক্রীড়া বাজির সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সংকটে পড়েন। তার মতে, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য তরুণ পুরুষ জুয়ার কারণে ঋণ ও আর্থিক চাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের জুয়া সংস্কারকর্মী ম্যাট জার্ব-কাজিন। তিনি মনে করেন, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাজিতে অংশ নেওয়া অনেককে পরবর্তীতে আরও আসক্তিকর ক্যাসিনোভিত্তিক জুয়ার দিকে আকৃষ্ট করা হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন পূর্বাভাসভিত্তিক বাজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ, হত্যা এবং অন্যান্য আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত বাজির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। সম্প্রতি স্পর্শকাতর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাজির সুযোগ দেওয়ায় কিছু প্ল্যাটফর্ম সমালোচনার মুখে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্বকাপের উন্মাদনার সঙ্গে সঙ্গে বাজির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলার আনন্দ উপভোগ করাই হওয়া উচিত দর্শকদের প্রধান লক্ষ্য; আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে বাজির আসক্তিতে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্তব্য করুন