অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ এএম
অনলাইন সংস্করণ

জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে মোদি সরকারের উভয় সংকট

জ্ঞানেশ কুমারকে সরালেও বিপদ, রাখলেও বিপদ—নিজের পাতা ফাঁদে মোদি সরকার

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ এবং তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরালে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আরও গুরুত্ব পেতে পারে, আবার তাঁকে বহাল রাখলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত ১০ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে নির্বাচন কমিশনপ্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বড় সমাবেশের ডাক দেয় তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলো। বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। মুম্বাই থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ নয়াদিল্লিতে অবতরণের পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ও তাঁর দুই সহযোগী সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। কয়েক দিন পর দিপকে মুচলেকায় মুক্তি পেলেও তাঁর সহযোগীদের কারা হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটকের সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে দিপকেকে বলতে শোনা যায়, তিনি গ্রেপ্তার হতে এসেছেন এবং পুলিশকে ভয় পান না। অন্য একটি ভিডিওতে তাঁর কণ্ঠে সরকারবিরোধী মন্তব্য শোনা যায়। এসব ঘটনা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। এদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপির মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে সরকার যে তাঁর পাশে রয়েছে, সেই অবস্থানও প্রকাশ্যে এসেছে।

অবরুদ্ধ রাজধানী, ব্যাপক আটক

১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে নয়াদিল্লিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় দুই কোটি মানুষের এই শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা যাতে পার্লামেন্টের কাছের নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য বিভিন্ন প্রবেশপথে বাধা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাজারে বাধা, ব্যারিকেড, তল্লাশিচৌকি এবং যানবাহন পরীক্ষা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অনলাইনে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত করতে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার অভিযোগও ওঠে। সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই আন্দোলনের পরিচিত মুখ অভিজিৎ দিপকে, রত্না সিং এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরা এবং অধিকারকর্মী তুষার গান্ধীর নামও আটক হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আটক করার খবরও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এত বাধার পরও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। পুলিশ এক স্থান থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিলে তাঁরা অন্য জায়গায় জড়ো হন। দিল্লি হাটের মতো জনপ্রিয় স্থানেও ছোট ছোট প্রতিবাদ হয়। সন্ধ্যার মধ্যে অন্তত আড়াই হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ৬০০ জনকে আটক করার কথা বলা হয়।

পরদিন ১১ অক্টোবর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট আটকসংক্রান্ত পদক্ষেপকে অবৈধ বলে উল্লেখ করার পর অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। সৌরভ দাসও অভিযোগ করেন, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ রাজধানীকে দুর্গে পরিণত করে নাগরিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভয় দেখিয়ে তরুণদের জবাবদিহির দাবি থামানো সম্ভব হবে না।

সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দেখে অনেকের মনে পড়ছে ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে জারি করা জরুরি অবস্থার কথা। সমালোচকদের মতে, বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন ও আটকপ্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে বিতর্কের বিস্তার

এই আন্দোলনের পেছনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে আগে থেকেই জমে থাকা অসন্তোষ কাজ করছিল। তবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরলেও সেগুলোর যথাযথ সমাধান হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত কার্যকর হওয়ায় দুই কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভোটার তালিকার ভুল সংশোধনে বাধা তৈরি হচ্ছিল। অথচ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসব সংশোধনের দায়িত্ব তাঁদেরই।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর কংগ্রেসসহ বিরোধী দল এবং সিজেপি বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি শহরে সীমাবদ্ধ থাকা প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া ও ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিতর্ক

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের বিপুলসংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। উদ্যোগটি প্রথমে বিহারে শুরু হয় এবং পরে অন্যান্য রাজ্যেও সম্প্রসারিত হয়। উত্তর প্রদেশেও ২০২৫ সালের অক্টোবরে যাচাইপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপি নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বিভিন্ন শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তিকে মৃত, ছয় কোটি ৩০ লাখকে আগের ঠিকানা থেকে অন্যত্র চলে যাওয়া, এক কোটি ব্যক্তিকে একাধিকবার তালিকাভুক্ত এবং তিন কোটি ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসব নাম চিহ্নিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব ভোটারকে চূড়ান্তভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তালিকা হালনাগাদ করার সময় মৃত, স্থানান্তরিত, খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ব্যক্তি এবং একাধিক এলাকায় নিবন্ধিত ভোটারদের শনাক্ত করাই ছিল উদ্দেশ্য। যোগ্য ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগও রয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে।

বিরোধী দল ও সমালোচকদের কাছে এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। তাঁদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়া এবং আপিলের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত যোগ্য ভোটাররাও বাদ পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম না পেয়ে ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আন্দোলনকারীদের আরও দাবি, মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার যাচাইয়ের প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরোধী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।

বিজেপির বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কারণ তাদের নির্বাচনী সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। বিরোধীদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও করেছে দলটি। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং তা নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ার অংশ।

আগামী নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক উদ্বেগ

এই বিতর্কের সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশ, যা ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই পদ্ধতি ভবিষ্যতের নির্বাচনেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাঁদের মতে, যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঘটনা অব্যাহত থাকলে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণেই জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধীরা।

তবে সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নেওয়া হলে বিরোধীদের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে আরও জোরালো হতে পারে। আবার তাঁকে পদে বহাল রাখলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্ক দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো বা বহাল রাখা—দুই সিদ্ধান্তেই ঝুঁকি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকার কেন জ্ঞানেশ কুমারের পাশে এত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, সেটি বোঝার জন্য শুধু একজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নয়, পুরো নির্বাচনব্যবস্থার ওপর চলমান বিতর্ক বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রাজীব ভার্গবের মতে, কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি হলে তা দূর করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে নির্বাচন পরিচালনার নিরপেক্ষতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

ভার্গবের মতে, সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। নির্বাচন কমিশন নির্বাহী বিভাগের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিরা যখন কমিশনপ্রধানকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করেন, তখন প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

সরকারের অবস্থানের পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণও তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকেরা। প্রথমত, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগকে বিরোধীরা নিজেদের অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন এবং নতুন কমিশনপ্রধান সরকারের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তৃতীয়ত, বিতর্কটি কেবল একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনার সামগ্রিক পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দের মতে, বিষয়টি শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে নয়; বৃহত্তর নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হলে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করলেই এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান হবে না বলেও তিনি মনে করেন।

লেখক ও মোদির জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী এমন এক রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চান, যেখানে তাঁকে জনদাবির মুখে পিছু হটতে দেখা যাবে না। তাঁর মতে, এই ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রচেষ্টাও সরকারের কঠোর অবস্থানের একটি কারণ হতে পারে। তবে সরকারের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

আলোচনার বদলে কঠোর অবস্থান

বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা না করে সরকার কেন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকেরা। রাজীব ভার্গবের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান সংসদীয় বিতর্ক, দলগুলোর মধ্যে আলোচনা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। এসব পথ কার্যকর না হলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করাকে একমাত্র উপায় হিসেবে দেখতে পারেন।

তাঁর বিশ্লেষণে, সরকারের প্রতিক্রিয়া মূলত কঠোর অবস্থানে অনড় থাকা এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষা করার দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, আলোচনা ও জবাবদিহির সুযোগ না থাকলে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিক্ষোভের শুরুতে দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে মন্তব্য না করার পর তিনি বিরোধীদের আত্মসমালোচনা করার পরামর্শ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র আন্দোলনকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, তাঁদের বিক্ষোভ ব্যর্থ হয়েছে এবং ভারতের সামগ্রিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

তবে আন্দোলনকারীদের মতে, সরকারের কঠোর পদক্ষেপ তাদের দাবি থামাতে পারবে না। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি, ভোটার তালিকা সংশোধনে স্বচ্ছতা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার সুরক্ষার দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন।

বিরোধী জোটের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে

কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল জানিয়েছেন, বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং এ দাবি থেকে বিরোধীরা সরে আসবে না।

বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আসছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনসংক্রান্ত এক বিক্ষোভে তাঁকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। ১০ অক্টোবরের সমাবেশের আগে বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেন। এতে তাঁরা অভিযোগ করেন, সরকারের পদক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি তৈরি করছে।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের দমন করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, আটক বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নাগরিকদের প্রতিবাদ থামানো যাবে না।

দক্ষিণ ভারতেও আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছে। চেন্নাইয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত গণতন্ত্র রক্ষার বিক্ষোভে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোটার তালিকার অনিয়ম এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এ ছাড়া নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদীও ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তরুণদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।

জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা

বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে ভারতে এর আগে হওয়া তরুণদের আন্দোলনের তুলনা করছেন অনেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে সিজেপি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে আন্দোলন করেছিল। সেই আন্দোলনে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অচল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজীব ভার্গবের মতে, সে সময় পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ তরুণ ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আন্দোলনের ফলে বিরোধী নেতাদের বক্তব্যও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। অপূর্বানন্দের মতে, ওই অভিজ্ঞতা তরুণদের কাছে সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি তৈরি করেছিল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান আন্দোলনের একটি শক্তি হলো তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে ব্যঙ্গ, নতুন ধরনের স্লোগান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা আন্দোলনকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। তবে এবারের পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের দিকে যাবে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন।

মোদি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান কি দুর্বল হচ্ছে?

নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাফল্য উদ্‌যাপন করলেও বর্তমান বিক্ষোভ সরকারের সামনে নতুন চাপ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন কিছু পর্যবেক্ষক। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ডনিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুরের মতে, বিজেপি জনমত নিজেদের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। তাঁর ধারণা, সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হতে পারে।

তবে এসব মূল্যায়ন বিশ্লেষকদের মতামত; এগুলোকে নিশ্চিত রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে দেখা যায় না। সরকারের জনপ্রিয়তা, বিরোধীদের সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।

বর্তমান বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও ভোটারদের অধিকার নিয়ে জনআস্থা কীভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদে বহাল রাখা হলে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে হবে। আর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, একজন নির্বাচন কমিশনপ্রধানকে ঘিরে শুরু হওয়া বিরোধ এখন ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বৃহত্তর আলোচনায় পরিণত হয়েছে। মোদি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ কেবল একজন কর্মকর্তাকে পদে রাখা বা সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা এবং ভোটারদের অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৬ মাসে বিএনপি সরকার নিদারুণভাবে ব্যর্থ: নাহিদ ইসলাম

1

বাবার টাকা চুরি করে প্রেমিকার সঙ্গে রিসোর্টে অবস্থান, আইফোন

2

তাপপ্রবাহ ও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

3

চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু দক্ষিণ কোরিয়ার

4

ডিএমপিতে বড় রদবদল : ৫ এডিসিকে বদলি

5

বিশ্বকাপের প্রাইজমানি: স্পেন পেল ৬১৫ কোটি, আর্জেন্টিনা ৪০৬ ক

6

আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের প্রস্তাব রাশেদ খানের

7

বিদেশি শিক্ষার্থীরা চাকরি করতে চাইলে দিতে হবে ১ লাখ ডলার ফি

8

আবারও বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বে সাকিব

9

আগামী ৫ দিন কেমন থাকবে জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

10

২০ মাসে ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ শিশু

11

মেসির বিদায়ে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হোসে মরিনহোর আবেগঘন বার্তা

12

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ২২৮ পদে নিয়োগ, আবেদন ২৯ অ

13

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমলো, ভরিতে বড় পতন

14

আওয়ামীলীগ ব্যাক করেছে দেখো নাই : মাহফুজ আলম

15

জুমার দিনের ৮টি গুরুত্বপূর্ণ আমল, জেনে নিন ফজিলত

16

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে আইনানুগ ব্যবস্থা: তথ্য উপদেষ

17

মেসির গোল্ডেন বল 'ছিনতাই' করা হয়েছে: ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি

18

শাকিরা-পিকের ব্যবহৃত বাড়ি কিনলেন বিশ্বকাপজয়ী ইয়ামাল, খরচ কত?

19

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে নিহত ৪, বিদ্যুৎহীন ৬ লাখ মানুষ

20