ইউরোপের দুই দেশ সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে আজ রোববার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। সার্বিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচনে দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুসিচের দলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা। আর বুলগেরিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
তিন দেশের নির্বাচনেই অর্থনীতি, দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিলে আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম দফায় সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। তবে কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়িয়েছে।
শেষ দফার জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। আজকের ভোটে নির্ধারিত হবে, আগামী চার বছর দেশটি বামপন্থী নেতৃত্বে থাকবে, নাকি ডানপন্থীদের হাতে ক্ষমতা ফিরে যাবে।
লুলা চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী সপ্তাহে তাঁর বয়স ৮১ বছর হবে। এটিই তাঁর শেষ নির্বাচনী লড়াই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লুলা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে ফ্লাভিও অপরাধ দমন এবং সরকারি ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতি নিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। লুলার সরকারের বিরুদ্ধে খাদ্যের উচ্চমূল্য ও দুর্নীতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। তবে তাঁর সমর্থকদের দাবি, সরকারের সামাজিক কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করেছে।
২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলায় জইর বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। তিনি বর্তমানে গৃহবন্দী। নির্বাচিত হলে বাবাকে মুক্ত করা হবে নিজের প্রথম কাজ—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফ্লাভিও।
সার্বিয়ায় আজ আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচের জন্য এ নির্বাচন বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
২০২৪ সালে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এ ঘটনার পর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা নিজেরা নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তাঁদের সমর্থিত প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ২৫০ জন। এ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনেতা ও কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। তালিকার নেতৃত্বে আছেন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিজা সারদানোভিচ।
জনমত জরিপে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ও শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন জরিপে দুই পক্ষের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
ভুসিচের সমর্থকদের মতে, তাঁর শাসনামলে দেশটির অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে। নির্মিত হয়েছে নতুন মহাসড়ক, রেলপথ, স্কুল ও হাসপাতাল। তিনি পেনশন এবং সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা দুর্নীতি বন্ধ ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই রাজনীতিতে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
তাঁদের প্রার্থীরা জয়ী হলে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বলকান দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সার্বিয়ায় স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোটকেন্দ্র খুলবে এবং রাত আটটায় ভোট গ্রহণ শেষ হবে।
বুলগেরিয়ায় আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট হচ্ছে। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মোট ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভা ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই গিউরভ।
ইয়োতোভা আগে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গত জানুয়ারিতে রুমেন রাদেভ পদত্যাগ করে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
আলফা রিসার্চের এক জনমত জরিপে ইয়োতোভা ৪১ শতাংশ এবং গিউরভ ২৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ইয়োতোভাকে সমর্থন দিচ্ছেন রাদেভ। অন্যদিকে পশ্চিমাপন্থী ও সংস্কারপন্থী দলগুলো গিউরভের পাশে রয়েছে।
বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও এবারের নির্বাচনে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক ড্রোন হামলার ঘটনাও নির্বাচনে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব হামলায় প্রায় দুই ডজন আন্তর্জাতিক নাবিক নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গিউরভ ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি কিয়েভের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি করেন। অন্যদিকে ইয়োতোভা ও রাদেভ যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ইয়োতোভা জয়ী হলে তিনি হবেন বুলগেরিয়ার সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
দেশটিতে স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোট শুরু হবে এবং রাত আটটায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে। কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে আগামী ১ নভেম্বর দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ব্রাজিল, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার নির্বাচন তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হলেও অর্থনৈতিক চাপ, দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই ভোটারদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের ফলাফল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্তব্য করুন