গোলের উল্লাসে রোমেলু লুকাকুকে বহুবার দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু প্রতিটি গোলের আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে আরেকটি পরিচয়, নেতার পরিচয়। ২০১০ সালে বেলজিয়ামের জার্সিতে অভিষেকের পর দেড় দশকের পথচলায় তিনি শুধু দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাই হননি। হয়ে উঠেছেন ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোর একটি।
২০২৬ বিশ্বকাপে তাই লুকাকুর ভূমিকা আর শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠের ভেতরে ও বাইরে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণার আলো ছড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছেন তিনি।
এবারের বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সাফল্যের পেছনে শুধু কৌশল বা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়-- দলের ঐক্যও বড় ভূমিকা রাখছে। শেষ ষোলো পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর বেলজিয়াম দল আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের জালে বল জড়িয়ে বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার বিখ্যাত নাচ অনুকরণ করে উদযাপন করেন। ম্যাচ শেষে প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়া বলেন, তার দল যথেষ্ট পরিণত এবং অভিজ্ঞ নেতারাই সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
সেই নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন লুকাকু। অন্যদিকে, কেভিন ডি ব্রুইনা অনুশীলন ও মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে সতীর্থদের সামনে পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ২০১০ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে লুকাকু ১৩১ ম্যাচে ৯৩ গোল করেছেন। গোলের এই পরিসংখ্যান যেমন তাকে বেলজিয়ামের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে। তেমনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে দলের স্বাভাবিক নেতার আসনেও বসিয়েছে।
তবে বেলজিয়ামের ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ভাষার বৈচিত্র্য। দেশটির ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানের কারণে জাতীয় দলে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও শিকড়ের খেলোয়াড়।
২০২৬ বিশ্বকাপ বেলজিয়াম দলে কঙ্গো, ঘানা, গিনি বিসাউ, সেনেগাল, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলাররাও আছেন। এই বৈচিত্র্যের মাঝেও লুকাকু সাবলীলভাবে ছয়টি ভাষায় কথা বলতে পারেন। যা তাকে সতীর্থদের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধনে পরিণত করেছে।
বেলজিয়ামের উত্তরের ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের মাতৃভাষা ডাচ। অন্যদিকে, দক্ষিণের ওয়ালোনিয়া অঞ্চলের খেলোয়াড়রা মূলত ফরাসিভাষী। অনেকেই দুই ভাষায় দক্ষ হলেও সবাই নন। তাই দলগত যোগাযোগের জন্য ইংরেজিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. জিম ইউরেলের মতে, এটি অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। কারণ বেলজিয়ামে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি পরিচয় ও রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ইংরেজি ব্যবহারের ফলে ভাষাগত সংবেদনশীলতা এড়িয়ে সবাই একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে যোগাযোগ করতে পারেন।
স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের মতো বড় পরীক্ষায় বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো শুধু কৌশল, গতি কিংবা দক্ষতা নয়। দলের ভেতরের বিশ্বাস, পারস্পরিক আস্থা এবং লুকাকুদের মতো অভিজ্ঞদের নেতৃত্বও হতে পারে তাদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। এটি আর কেবল সোনালি প্রজন্মের শেষ অভিযানের গল্প নয়। বরং অভিজ্ঞদের হাত ধরে নতুন এক বেলজিয়ামের জন্মের গল্প, যেখানে আজকের নেতারাই তৈরি করছেন আগামী দিনের উত্তরসূরিদের।