একসময় বিদেশি অস্ত্র নির্মাতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল তুরস্ক এখন বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম উদীয়মান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। গত দুই দশকে ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশটি সামরিক সরঞ্জাম রফতানিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বর্তমানে তুরস্ক উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। বিশেষ করে সশস্ত্র ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশটির অগ্রগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত সশস্ত্র ড্রোনের বড় একটি অংশ এখন তুর্কি নির্মাতাদের কাছ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহকারীর খোঁজ করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক শুধু কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই নয়, বরং প্রতিরক্ষা শিল্পে নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সহযোগী হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বাজারে তুরস্কের দ্রুত উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সহায়তা, তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা, নমনীয় সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত সমাধান প্রদানের সক্ষমতা। ফলে অনেক দেশের কাছে তুর্কি প্রতিরক্ষা পণ্য আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি আয় কয়েকগুণ বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে দেশটির শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগামী দুই বছরের মধ্যে রফতানি আয় আরও দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই আয়ের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন, শিল্প সম্প্রসারণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণের অন্যতম চালিকাশক্তি। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে দেশটি নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে চায়। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান প্রযুক্তি এবং সাঁজোয়া যান উন্নয়নের মতো খাতেও তুরস্ক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা এবং রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে তুরস্ক শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই পাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রভাবও বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে তুরস্কের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন