চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন, তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং হাসপাতালে যেতে চান বলেও জানিয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় মঙ্গলবার এ কথা বলেন তিনি।
মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে উপাচার্য ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরেন শেখ শরীফুল আলম। তিনি জানান, বুকের বাঁ পাশে ব্যথা হচ্ছে এবং তিনি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চান।
এর আগে সোমবার দুপুর ১২টার পর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ভবনের ভেতরে রেখে ফটকে তালা দেন। একই সঙ্গে ভবনের পানি ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এতে উপাচার্যসহ অন্তত ১১ জন ভবনটির ভেতরে আটকা পড়েন।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন সাংবাদিক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উপাচার্য ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে তাঁরা উপাচার্যের সঙ্গে কথা বললে তিনি বুকে ব্যথার বিষয়টি জানান।
উপাচার্যের অসুস্থতার খবর পেয়ে বেলা দেড়টার দিকে তাঁর দপ্তরে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক মো. শাহাবুদ্দিন। পরীক্ষা করার পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, উপাচার্যের পালস ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রয়েছে।
চিকিৎসক শাহাবুদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, উপাচার্যের রক্তচাপ ছিল ১২০/৮০। তিনি বলেন, পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। উপাচার্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি বলেও উল্লেখ করেন ওই চিকিৎসক।
শাহাবুদ্দিন আরও জানান, উপাচার্য অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকায় অস্বস্তি বোধ করছেন বলে তাঁকে জানিয়েছেন। মাঝেমধ্যে রক্তচাপের ওষুধ খাওয়ার বিষয়টিও চিকিৎসকের কাছে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
পরে বেলা দুইটার দিকে উপাচার্যকে দেখতে যান রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা টিপুল কান্তি দে। পরীক্ষা শেষে তিনি উপাচার্যের রক্তচাপ ১৫০/১০০ পেয়েছেন বলে জানান।
টিপুল কান্তি দে বলেন, উপাচার্য তাঁর বুকে ব্যথা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তাঁকে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দুই চিকিৎসকের পরীক্ষায় রক্তচাপের ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও উপাচার্যের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁদের বক্তব্য আলাদা ছিল। একজন রক্তচাপ স্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন, অন্যজন তুলনামূলক বেশি রক্তচাপ পেয়েছেন এবং হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
চুয়েটের উপাচার্য পদে পরিবর্তনের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অচলাবস্থা চলছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। অন্যদিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পালন করছেন কর্মবিরতি। আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
আন্দোলনের কারণে দায়িত্ব নেওয়ার পরও নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসতে পারছিলেন না। তবে সোমবার শাখা ছাত্রদলের নেতাদের নিয়ে উপাচার্য ভবনে শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ভেঙে তিনি নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন।
নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসার খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টা থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর দপ্তরের সামনে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা উপাচার্যকে কার্যালয় ছাড়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর দুপুর ১২টার দিকে আবারও উপাচার্য ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন তাঁরা। বিচ্ছিন্ন করা হয় পানি ও বিদ্যুৎ-সংযোগ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, উপাচার্য পদত্যাগ করলেই তাঁরা তালা খুলে দেবেন। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, উপাচার্য পদত্যাগ করলে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আহসানউল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁদের অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। উপাচার্য এভাবে ক্যাম্পাসে আসবেন, তা তাঁরা ভাবেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধ্যাপক আহসানউল্লাহ বলেন, উপাচার্য আগে তাঁর সঙ্গে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে উল্লেখ করতেন। এখন তাঁরাই যেন তাঁকে সহযোগিতা করেন—এমন মন্তব্যও করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি।
উপাচার্যের শারীরিক অসুস্থতা, শিক্ষার্থীদের পদত্যাগের দাবি এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি মিলিয়ে চুয়েটে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন