যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই তীব্র হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার আশা দেখছেন ডেমোক্র্যাটরা।
তবে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা মানেই নির্বাচনে জয় নিশ্চিত নয়। রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনি প্রচারে ব্যয়ের পার্থক্য শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ আসনের দিকে নজর রাখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সিএনএনের জন্য এসএসআরএস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, নিজ নিজ কংগ্রেসনাল আসনে পছন্দের প্রার্থীর ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা ১০ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। একই জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন পাওয়া গেছে মাত্র ৩৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের।
তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ের জনমতের পাশাপাশি প্রতিটি রাজ্যের আলাদা রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও অন্য রাজ্যে রিপাবলিকানদের শক্ত অবস্থান তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলটির সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জরিপে কুপার এগিয়ে থাকায় আসনটি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা বেড়েছে।
প্রচারের শেষ দুই সপ্তাহে বিজ্ঞাপনে ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে ডেমোক্র্যাটরা। বিপরীতে রিপাবলিকানদের পরিকল্পিত ব্যয় ২৫ লাখ ডলার। এই ব্যবধান নির্বাচনি প্রচারে দুই দলের কৌশলগত অগ্রাধিকারের চিত্র তুলে ধরছে।
ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন এবং রিপাবলিকান সিনেটর জন হুস্টেডের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘনিষ্ঠ হতে পারে।
সিএনএনের জরিপের গড় হিসাবে ব্রাউন ৪৯ শতাংশ এবং হুস্টেড ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। নির্বাচনের শেষ দুই সপ্তাহে রাজ্যটিতে দুই দল মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিজ্ঞাপনে ব্যয় করতে পারে।
এই আসনের ফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আলাস্কায় ডেমোক্র্যাট সাবেক কংগ্রেস সদস্য মেরি পেলটোলা রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে লড়ছেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার এক জরিপে পেলটোলা সাত পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন সুলিভান। তাঁর মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়া প্রয়োজন, কারণ এর অর্থনৈতিক প্রভাব আলাস্কার বাসিন্দাদের ওপরও পড়েছে। জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় তাই এই আসনে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। সাম্প্রতিক জরিপে কোনো প্রার্থীই স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে নেই।
ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ এবং গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে কলিন্সের অবস্থান নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমলা হ্যারিস জয়ী হয়েছিলেন এমন রাজ্যগুলোর মধ্যে মেইন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী একমাত্র রিপাবলিকান সিনেটর কলিন্স।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো ও রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের লড়াই ঘনিষ্ঠ বলে জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সিএনএনের জরিপের গড় হিসাবে টালারিকো ৪৯ শতাংশ এবং প্যাক্সটন ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।
টালারিকোর প্রচারকৌশল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে রাজ্যটিতে দীর্ঘদিন ধরে দলটির রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় না পাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পও টেক্সাসে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
নির্বাচনি বিজ্ঞাপনেও রিপাবলিকানদের ব্যয়ের পরিকল্পনা অনেক বেশি। প্রাইমারি ও সাধারণ নির্বাচন মিলিয়ে প্যাক্সটনের পক্ষে ৩৮ কোটি ডলারের বেশি বিজ্ঞাপন ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাইয়েদ ও সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে উত্তেজনা রয়েছে। সিএনএনের জরিপের গড় হিসাবে এল-সাইয়েদ ৪৯ শতাংশ এবং রজার্স ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।
এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক অবস্থান ও পরিচয় নিয়ে প্রচারে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকানরা তাঁকে ইসলামি সন্ত্রাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, এল-সাইয়েদ এসব অভিযোগের বিরোধিতা করেছেন এবং তাঁর প্রতি অন্যায্য আচরণ করা হচ্ছে বলে যুক্তি দিয়েছেন।
শেষ দুই সপ্তাহে রিপাবলিকানদের প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ডলার এবং ডেমোক্র্যাটদের দেড় কোটি ডলার বিজ্ঞাপনে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট জশ টুরেক ও রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘনিষ্ঠ। সিএনএনের জরিপের গড় হিসাবে টুরেক ৪৭ শতাংশ এবং হিনসন ৪৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।
রাজ্যটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। জরিপে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের নীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ভোটারদের এই মনোভাব নির্বাচনের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কানসাসে ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিল্টন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার এক জরিপে দুজনের সমর্থন সমান দেখা গেছে।
রাজ্যটিতে দীর্ঘ ৯৪ বছর ধরে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি। ফলে এই আসনে জয় পেলে তা দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ঘটনা হবে। অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ মার্শালের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ক্রিস পাপাস রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর জন সুনুনুর বিরুদ্ধে লড়ছেন। ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক জরিপে পাপাস আট পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
রাজ্যটিতে ট্রাম্পের কম জনপ্রিয়তা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে জরিপের ব্যবধান নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বজায় থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত বলে জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত আটলান্টা জার্নাল-কন্সটিটিউশনের এক জরিপে রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক কলিন্সের চেয়ে অসফ আট পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। জরিপে অসফের সমর্থন ছিল ৪৮ শতাংশ, আর কলিন্সের ৪০ শতাংশ।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জর্জিয়ায় জয়ী হলেও সিনেট নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা ও অন্যান্য ইস্যু আলাদা ভূমিকা রাখতে পারে। এই আসন ধরে রাখতে পারলে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার হিসাব কিছুটা সহজ হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ডেমোক্র্যাটদের জন্য নির্বাচনি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী রাজ্যভিত্তিক অবস্থান, বিজ্ঞাপনে বিপুল ব্যয় এবং প্রতিটি আসনের আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণ ডেমোক্র্যাটদের পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আলাস্কা ও টেক্সাসের মতো রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসনের ফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। জনমত জরিপ বর্তমান পরিস্থিতির একটি ধারণা দিলেও তা চূড়ান্ত ফলের নিশ্চয়তা নয়। নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনোভাব বদলালে পুরো রাজনৈতিক সমীকরণও পাল্টে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন