ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির কারণে। অতিরিক্ত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন, নৌবহর পাঠানোর পরিকল্পনা এবং ইসরাইলি বাহিনীর উচ্চ সতর্কাবস্থা নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তেহরান।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুর পর থেকে দুই দেশের কেউই স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলা চালায়নি। তবে সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি কর্মসূচির পরিচালক সুজান ম্যালোনি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন করে হামলা শুরু হতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ম্যালোনির মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পাঠানো, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্কবার্তা এবং ইসরাইলি বাহিনীর উচ্চ সতর্কাবস্থা সম্ভাব্য নতুন অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে নির্বাচনের আগে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি হামলা চালাবেন না। এ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনসমর্থন পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
ম্যালোনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে অবরোধ কার্যকর রাখতে ওয়াশিংটনকে বিপুলসংখ্যক নৌসামরিক সম্পদ মোতায়েন রাখতে হচ্ছে।
তার মতে, পরিস্থিতির সমাধানে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ অথবা সামরিক পদক্ষেপের মতো কোনো পথ বেছে নিতে হতে পারে।
শুক্রবার ইরান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, চাইলে সংঘাত খুব দ্রুত শেষ করা সম্ভব। তবে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ করা হবে, নাকি ইরানকে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে দেওয়া হবে—সে বিষয়েও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক সপ্তাহান্তে ইরানে হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। ইসরাইলে মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে এমন হামলা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার বেশ কিছু ইঙ্গিত দেখা গেছে। একই সঙ্গে ইরান কিংবা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায়ও যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হতে পারে।
ক্যাম্পবেলের তথ্যমতে, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি মোতায়েন করা হলে ওই অঞ্চলে সাময়িকভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরির স্ট্রাইক গ্রুপের সংখ্যা তিনটিতে পৌঁছাতে পারে। এ ছাড়া আরও একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরানে আগের হামলার মতো শক্তি প্রদর্শন করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরাইল সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ক্যাম্পবেলের মতে, নতুন করে হামলা ঠিক কখন শুরু হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন। ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাপ দেওয়াই যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এত ব্যাপক সামরিক তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগের পর্যায়ের তুলনায় ট্রাম্পের সামনে এখন বিকল্প কম। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সম্ভাব্য স্থল অভিযানও আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্যাম্পবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযানে হাজার হাজার, এমনকি পরিস্থিতিভেদে কয়েক দশ হাজার সেনার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এত বড় বাহিনী নিরাপদে মোতায়েন করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা বর্তমানে নেই।
ম্যালোনির মতে, আগের হামলাগুলোতে ইরানের অধিকাংশ প্রচলিত সামরিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নতুন করে অভিযান শুরু হলে বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তিনি মনে করেন, সামরিক অভিযান বাড়ালেই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হবে না। শুরু থেকেই এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা কোনো পক্ষের হামলা বাড়ানোর মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়লেও ইরানে নতুন হামলার সময়, পরিধি ও লক্ষ্য এখনো অনিশ্চিত। কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন