গভীর রাতে কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকার টাউন হল মাঠের আশপাশে এখন আগের মতো কিশোর-তরুণদের জটলা দেখা যায় না। প্রকাশ্যে মাদকসেবন, বিকট শব্দে মোটরসাইকেল চালানো এবং রাতভর আড্ডার দৃশ্যও অনেকটাই কমেছে। এক মাস ধরে কিশোর গ্যাংবিরোধী ধারাবাহিক অভিযানের পর নগরের রাতের পরিবেশে এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
টাউন হল মাঠ থেকে কিছুটা দূরে সার্কিট হাউস মোড়ের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠেও আগের মতো কিশোর-তরুণদের জটলা চোখে পড়ছে না। একই চিত্র কুমিল্লা রেলস্টেশনসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায়।
তবে অপরাধের এই নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি ধরে রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে গণমাধ্যমে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে স্কুলশিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা এলাকায় লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পুলিশি তদন্ত ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। ওই ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের অভিযানে মোট ৩ হাজার ৪১২ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮৬ জনের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১ হাজার ২৬ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিযানে নগরের আলোচিত কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতারাও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ‘আর স্কোয়াড’ বা ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান হিসেবে পরিচিত ইমরান হোসেন ওরফে রতনও রয়েছেন।
কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় রাতের পরিবেশে পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পেশাজীবীরা।
চকবাজার এলাকার অটোরিকশাচালক মোশাররফ হোসেন জানান, আগে রাতে গলির ভেতর দিয়ে গাড়ি চালাতে ভয় পেতেন। কয়েকবার ছিনতাইয়ের শিকারও হয়েছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের পর তাঁর ভয় অনেকটাই কমেছে।
টাউন হল মাঠের চা-দোকানি এরশাদ মিয়াও পরিবেশ বদলানোর কথা জানিয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাতে সেখানে ব্যবসা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আগে রাতভর কিশোর-তরুণদের ভিড় থাকত। এখন বেচাকেনা কিছুটা কমলেও নিরাপদে দোকান চালাতে পারছেন এবং মাদকের গন্ধও আগের মতো পাচ্ছেন না।
পুলিশের দাবি, এক মাসের ধারাবাহিক অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অনেকটাই কমেছে। তবে এটিকে অপরাধ নির্মূলের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে দেখছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ধারাবাহিক অভিযানের পর রাতের জটলা ও মাদকসেবন অনেকটাই কমেছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের কাছ থেকেও পুলিশ সহযোগিতা পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন মামলার এজাহার ও অপরাধের ধরন পর্যালোচনা করে ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমানের ভাষ্য, অভিযানের ফলে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তবে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে কোনো পৃষ্ঠপোষক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাঁদের যাচাই-বাছাই করে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই এমন তৎপরতা দেখালে কিশোর গ্যাংগুলো এতটা বিস্তারের সুযোগ পেত না।
তাঁর মতে, গত এক মাসে নগরের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেছে। তবে এই পরিবর্তন ধরে রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খানও কিশোর গ্যাং বিস্তারের পেছনে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মী নিজেদের প্রভাব ও পেশিশক্তি বাড়াতে এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেন। এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিভাবকদেরও সন্তানদের প্রতি নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর তাদের চলাফেরা সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কুমিল্লার রাতের পরিবেশে স্বস্তি ফিরতে শুরু করলেও অপরাধের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। নিয়মিত নজরদারি, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ধরে রাখা সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন