ইউক্রেনের কিছু দ্রুতগতির অস্ত্র ও ড্রোনে স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা ডিভাইসগুলো স্টারলিংকের নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিধিনিষেধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক।
রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন পরিচালনা এবং নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে ইউক্রেনের জন্য স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। তবে গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ নতুন গতিসীমা কার্যকর হওয়ার পর দেশটির কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক উপদেষ্টার ধারণা, এ ঘটনা নিছক কারিগরি সমস্যা নয়; কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড—দুটিই ইলন মাস্কের মহাকাশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সেবা। তবে তাদের ব্যবহার আলাদা। স্টারলিংক মূলত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন ব্যবহারকারীকে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। অন্যদিকে, স্টারশিল্ড তৈরি করা হয়েছে সরকারি, সামরিক ও গোয়েন্দা প্রয়োজনে।
ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা সংযোগ স্বাভাবিক করার জন্য মাস্কের কাছে একের পর এক অনুরোধ জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এসব বার্তার জবাব দিতে গিয়ে মাস্ক বলেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে। এর ব্যবহার বা গতির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মাস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের বিধিনিষেধের সিদ্ধান্তকে সরাসরি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে স্টারলিংকের মূল সেবা বেসামরিক ব্যবহারকারী ও আত্মরক্ষার প্রয়োজনে তৈরি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামরিক অভিযানে ইন্টারনেট সরবরাহ করা নীতিগতভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্নও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাতে স্টারলিংক এমন একটি নিয়ম চালু করে, যার ফলে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা কোনো ডিভাইসের ইন্টারনেট সংযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইউক্রেনের যেসব দ্রুতগতির ড্রোন বা অস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার সময় এ সীমা অতিক্রম করছিল, সেগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা দ্রুত সংযোগ স্বাভাবিক করার দাবি জানান। দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরোভ জানান, পরদিন বুধবার সন্ধ্যার দিকে সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি স্টারশিল্ডের ওপর আরোপিত গতিসীমার কড়াকড়ি পুরোপুরি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংযোগ আংশিক স্বাভাবিক হওয়ায় ফেদোরোভ মাস্ককে ধন্যবাদও জানান এবং ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার অনুরোধ করেন। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মাস্ক তাঁর পোস্টের জবাব দেন। সেখানে তিনি স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
স্টারলিংক সংযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও কথা বলেছেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ঘটনাটি ভুলবশত ঘটেছে কি না, অথবা এর পেছনে বড় কোনো কারিগরি সমস্যা রয়েছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। তবে সংযোগ আবার চালু করার জন্য তাঁরা অনুরোধ জানাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ কি না—পিয়ার্স মরগানের এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, সত্যি বলতে তিনি ক্ষুব্ধ। তবে তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু রাগ বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিস্থিতি আরও জটিল।
ইউক্রেনের স্টারলিংক সংযোগে কড়াকড়ি আরোপের সময়েই দেশটির ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু করে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় কিয়েভে বেশ কয়েকজন নিহত হন। রুশ বাহিনী ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
জেলেনস্কি হামলাটিকে বড় আক্রমণগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, রাশিয়ার ঝাঁকে ঝাঁকে পাঠানো ড্রোনের বড় একটি অংশ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী আকাশেই ধ্বংস করেছে। তবে কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
হামলার কারণে ইউক্রেনজুড়ে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ড্রোন আঘাত হানার আগে তাঁদের সতর্ক করতে কোনো সংকেত বা সাইরেন বাজানো হয়নি।
এদিকে যুক্তরাজ্যে এক দিনের সফরে পৌঁছান জেলেনস্কি। ডাউনিং স্ট্রিটে তাঁকে স্বাগত জানান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। সফরে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
জেলেনস্কির যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগেই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইউক্রেনে বিশেষ ধরনের হালকা বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের গতি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। রাশিয়ার ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে এবং আকাশেই ড্রোন ধ্বংস করতে ইউক্রেনীয় বাহিনী এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
স্টারলিংকের সংযোগে বিধিনিষেধ, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিধিনিষেধ আরোপের পেছনে মার্কিন সরকারের নির্দিষ্ট ভূমিকা এবং এর সঙ্গে কিয়েভ-ওয়াশিংটন সম্পর্কের টানাপোড়েনের কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন