যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গোপনে ইসরায়েল সফর করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও এ সফরের খবর প্রকাশ করেছে, যদিও তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সফরের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, সোমবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন হেগসেথ। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর এ সফরের খবর প্রকাশ্যে আসে।
পেন্টাগন ও ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বৈঠকের উদ্দেশ্য এবং আলোচনার বিষয়বস্তু এখনো অস্পষ্ট।
ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহু এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। জনমত জরিপগুলোয় তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী জোটের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সম্ভাবনা উঠে এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গোপন সফরের খবর রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নির্বাচনের সঙ্গে সফরটির সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
হেগসেথের সফরের খবর সামনে আসার সময়ই নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন।
নেতানিয়াহুর প্রশংসা করে ট্রাম্প লেখেন, তিনি তাঁকে ‘পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ সমর্থন’ দিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘বিবি নেতানিয়াহু আপনাদের কখনো হতাশ করবেন না!’
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এ সমর্থন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন করবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল।
ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে ইসরায়েলের নির্বাচনে সরাসরি জড়াতে চান না বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে নিজেকে জড়াবেন না।
ভ্যান্সের ভাষ্য, নেতানিয়াহুকে সমর্থন করার বিরোধী তিনি নন, তবে নিজে তাঁকে সমর্থনও করছেন না। তাঁর এই বক্তব্য ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের দুই শীর্ষ নেতার অবস্থানের পার্থক্য তুলে ধরেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর একই দিন গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে নারী ও শিশুসহ বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলে এটিই প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যুদ্ধ পরিচালনা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরকারের নীতির মতো বিষয়গুলো নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে সংঘাতেও জড়িয়েছেন। চলতি বছরের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। তবে হেগসেথের সঙ্গে বৈঠকে ইরান, গাজা যুদ্ধ কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের তৈরি একটি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য অস্থিরতা থেকে সংঘাতের ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
তবে সতর্কবার্তাটির বিস্তারিত বিষয়বস্তু এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে হেগসেথের গোপন সফর, ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ভ্যান্সের নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও নেতানিয়াহুর বৈঠকের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।
মন্তব্য করুন