আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফুটবলের নিয়মকানুনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)। যদিও এসব নিয়ম আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬-২৭ মৌসুম থেকে কার্যকর হওয়ার কথা, তবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরেই প্রথমবারের মতো সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যেতে পারে।
ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ণবাদ ও বৈষম্য প্রতিরোধ, সময়ক্ষেপণ কমানো এবং ম্যাচের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যেই নতুন নিয়মগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে খেলোয়াড়, কোচ এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের জন্য বেশ কিছু নতুন নির্দেশনা কার্যকর হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে মাঠ ত্যাগ করলে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হবে। একইভাবে কোনো কোচ বা টিম অফিশিয়াল খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে উৎসাহিত করলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দল মাঠ ছেড়ে যাওয়ার কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে প্রতিপক্ষ দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
বর্ণবাদী বা আপত্তিকর মন্তব্য গোপন করার প্রবণতা ঠেকাতে আরও একটি কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। ম্যাচ চলাকালে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কোনো খেলোয়াড় যদি হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন, তাহলে সরাসরি লাল কার্ডের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
সময় নষ্ট করার প্রবণতা কমাতে থ্রো-ইন এবং গোল-কিকের ক্ষেত্রে নতুন কাউন্টডাউন পদ্ধতি চালু হচ্ছে। রেফারি দৃশ্যমানভাবে পাঁচ সেকেন্ড গণনা করবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থ্রো-ইন না নিলে বলের দখল প্রতিপক্ষ পাবে। অন্যদিকে গোলরক্ষক সময়মতো গোল-কিক নিতে ব্যর্থ হলে প্রতিপক্ষ দলকে কর্নার কিক দেওয়া হবে।
চোটপ্রাপ্ত খেলোয়াড়দের চিকিৎসা সংক্রান্ত নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল স্টাফ মাঠে প্রবেশ করলে চিকিৎসা শেষে তাকে এক মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে। তবে গোলরক্ষক, মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া খেলোয়াড় বা বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
বদলি খেলোয়াড় নামানোর ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফোর্থ অফিসিয়াল বোর্ড প্রদর্শনের পর মাঠ ছাড়তে যাওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সাইডলাইন অতিক্রম করতে হবে। অন্যথায় তার পরিবর্তে নামতে যাওয়া খেলোয়াড়কে অতিরিক্ত এক মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির ব্যবহারও আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো, ভুলভাবে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড প্রদর্শন কিংবা কর্নার কিক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংশোধনে ভিএআর ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। এছাড়া সেট-পিসের আগে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের ফাউল শনাক্ত করতেও ভিএআর রেফারিকে সহায়তা করবে।
নতুন নির্দেশনায় গোলরক্ষকের চিকিৎসার সময় মাঠের অন্য খেলোয়াড়দের কোচিং স্টাফের কাছ থেকে কৌশলগত নির্দেশনা নেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। খেলোয়াড়দের মাঠের ভেতরেই অবস্থান করতে হবে এবং সাইডলাইনে গিয়ে আলাদা নির্দেশনা গ্রহণ করা যাবে না।
এদিকে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক রাখা হয়েছে। প্রতি অর্ধে প্রায় ২২ মিনিটের সময় তিন মিনিটের পানি পানের বিরতি দেওয়া হবে, যা বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফুটবলের আধুনিকায়ন এবং ম্যাচ পরিচালনায় আরও স্বচ্ছতা আনতেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন নিয়মগুলোর কার্যকারিতা কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর ফুটবলপ্রেমীদের।
মন্তব্য করুন