অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে কবে, জবাবদিহি কোথায়

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি নীরবই থাকবে?

মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্যাতনের ভিডিও থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ—সব মিলিয়ে শিশুদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

লেখক মনযূরুল হকের আলোচনায় উঠে এসেছে, এ সমস্যা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তদারকির ঘাটতি, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানোর প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

শারীরিক শাস্তি থেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

লেখক নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর কঠোর শারীরিক শাস্তির চিত্র বর্ণনা করেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণে রয়েছে লাঠিপেটা, লাথি-ঘুষি এবং শিশুদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

বর্তমান সময়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং নির্যাতনের পরিণতি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদও আলোচনায় এনেছেন।

তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠার পর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্ন

লেখায় টাঙ্গাইলের একটি মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের অভিযোগের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে নতুন নামে আরেকটি মাদ্রাসা চালু করেন।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা প্রতিষ্ঠানের তদারকি, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

লেখক আরও প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রথমেই অভিযোগ অস্বীকার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

তবে শিশু নির্যাতনের অভিযোগের সংখ্যা বা সেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে কোনো দাবি করা হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।

শুধু মাদ্রাসার সমস্যা নয়, তবে দায় এড়ানোর সুযোগও নেই

লেখক উল্লেখ করেছেন, শিশু নির্যাতন শুধু মাদ্রাসায় ঘটে না। পরিবার, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, গৃহশিক্ষকসহ বিভিন্ন পরিবেশে শিশুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই সমস্যাটিকে শুধু একটি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যথাযথ নয়। তবে অন্যত্রও নির্যাতন ঘটে—এই যুক্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

যে প্রতিষ্ঠানেই শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হোক, সেখানকার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তদারকির ঘাটতি কীভাবে ঝুঁকি বাড়ায়?

লেখায় অপরাধবিজ্ঞানের ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি থিওরি’র আলোকে দেখানো হয়েছে, অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে যখন সম্ভাব্য অপরাধী, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং কার্যকর তদারকির অভাব একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে।

আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরা পরিবার থেকে দূরে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল হয়। সেখানে অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা না থাকলে বা তৃতীয় পক্ষের তদারকি দুর্বল হলে শিশুরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক মর্যাদার কারণে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দ্বিধা তৈরি হওয়ার বিষয়টিও লেখক আলোচনায় এনেছেন। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তির পরিচয় নয়, বরং তাঁর আচরণ, প্রমাণ এবং তদন্তের ফলাফলই জবাবদিহি নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত।

অভিযোগ যাচাইয়ে স্বচ্ছতা জরুরি

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ ওঠার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কোনো অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করা হলে তার পক্ষে প্রমাণ, তদন্তের পদ্ধতি এবং ফলাফল প্রকাশ করা জরুরি।

একইভাবে, অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য বিচার এবং ভুক্তভোগী শিশুর সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

লেখকের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাকে ধর্মের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা হলে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার বিরোধী নয়; বরং দায়িত্বশীল পরিচালনার অপরিহার্য অংশ।

শিশু সুরক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ জরুরি?

লেখায় কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • শিক্ষক ও কর্মীদের অতীত রেকর্ড যাচাই করে নিয়োগ দেওয়া।

  • শিশুদের সঙ্গে একান্তে অবস্থানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন করা।

  • শিশুদের জন্য গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা ও হটলাইন চালু করা।

  • মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে স্বাধীন শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করা।

  • অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা।

  • আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা।

  • শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং নির্যাতন শনাক্ত করার বিষয়ে শিক্ষক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে অভিযোগ গোপন রাখা কঠিন হবে এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

আলেমসমাজের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্র বা পরিবারের দায়িত্ব নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা বোর্ড এবং ধর্মীয় নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

লেখকের বক্তব্য, শিশু নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সহযোগিতা করা এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো উচিত। কোনো অভিযুক্তকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সুরক্ষা দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়সংগত নয়।

শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমেই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখা সম্ভব।

উপসংহার

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের অভিযোগের সমাধান ঢালাও দোষারোপ বা সব অভিযোগ অস্বীকার করার মধ্যে নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, স্বাধীন তদারকি, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহি।

শিশুরা যেন ভয় ছাড়াই শিক্ষা নিতে পারে, অভিযোগ জানাতে পারে এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে—এটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। আলেমসমাজ ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুর্গাপূজার মণ্ডপে পাহারায় থাকবে বিএনপি নেতাকর্মীরা, জানালেন

1

আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে বসতে পারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা

2

স্পেন-বেলজিয়াম ম্যাচে কে জিতবে, জানাল সুপার কম্পিউটার

3

২০ বছর অপেক্ষার পর পাকিস্তানি দম্পতির স্বপ্ন পূরণ

4

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

5

সংসদ সচিবালয় কমিশনের ৩৭তম বৈঠক অনুষ্ঠিত

6

ইউএনএইচসিআরে প্রথমবার সভাপতির দায়িত্বে বাংলাদেশ

7

২০০ বছর পর বংশে কন্যাসন্তান, রথে চড়িয়ে রাজকীয় বরণ

8

সরকারকে বিপদে ফেলতে মিথ্যা ছড়ানো ষড়যন্ত্র: রিজভী

9

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শনিবার সংবাদ সম্মেলন

10

ঈদুল আজহায় সংবাদপত্রে ৫ দিনের ছুটি ঘোষণা

11

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট নভেম্বরে চালুর

12

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প

13

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে উঠেই বিপদে আর্জেন্টিনা

14

ফরিদপুরে মা-মেয়েসহ ৩ জনকে কুপিয়ে হত্যা

15

মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের আগে যে কারণে সতর্ক আর্জেন্টিনা

16

এবার পুরস্কার পাচ্ছেন ১০৭ পুলিশ সদস্য

17

বিশ্বকাপে রূপকথা লিখে গেলেন ভোজিনহারা, বিশ্বকে শেখালেন স্বপ্

18

নিজেদের চরকায় তেল দিন, জুয়ার বিতর্কে রেগে সমালোচকদের জবাব নে

19

হঠাৎ কেন ভাইরাল ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গান, জেনে নিন ঘটনা

20