বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে প্যাশন ফল, যা কোনো কোনো এলাকায় আনারকলি, ট্যাং ফল বা শরবতি ফল নামেও পরিচিত। তুলনামূলক অপরিচিত এই ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়লেও এর বাণিজ্যিক বাজার কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে কৃষিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ ফলটিকে পর্যটন এলাকার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন, জুস ও শরবত তৈরির শিল্পেই এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যাশন ফল বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে ফলটির সংরক্ষণকাল, ভোক্তাদের পরিচিতি এবং বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে এর বাণিজ্যিক চাষ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আব্দুর রহিম প্রায় দুই দশক আগে দেশে প্যাশন ফলের চাষ জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, সঠিকভাবে গাছের যত্ন নিলে একবার রোপণের পর দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ও ফল পাওয়া সম্ভব।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ থেকে প্যাশন ফলের বিভিন্ন জাত সংগ্রহ করা হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ফলটির কয়েকটি জাত চাষ হচ্ছে, যদিও জাতগুলোর মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নয় বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক আব্দুর রহিমের মতে, প্যাশন ফল জুস ও শরবত তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী। এর ফুলও আকর্ষণীয় ও সুগন্ধযুক্ত। লতানো এই গাছ উপযুক্ত পরিচর্যায় দীর্ঘদিন ফল দিতে পারে বলে জানান তিনি।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফলের আদি উৎস দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার পার্বত্য অঞ্চল। পরে ফলটি আফ্রিকা, ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতেও এর বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে।
বাংলাদেশে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড়ের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্যাশন ফল চাষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ফলটি সাধারণত ফুল ফোটার ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর সংগ্রহের উপযোগী হয়। খোসার রং সবুজ থেকে বেগুনি বা হলুদ হওয়া, সামান্য কুঁচকে যাওয়া এবং গন্ধ তীব্র হওয়া পাকার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যাপক আব্দুর রহিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বছরে একটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ফল পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে গাছপ্রতি ফলের সংখ্যা বেড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত হতে পারে।
তবে প্রকৃত ফলন নির্ভর করে জাত, মাটি, আবহাওয়া, পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং পরাগায়নের মতো বিষয়ের ওপর। ফলে সব এলাকায় একই পরিমাণ ফলন পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কৃষিবিদ তালহা মাসরুর জোবায়েরের মতে, প্যাশন ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে এর বাজার সীমিত। স্বাদ ও খাওয়ার ধরন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পরিচিতি কম হওয়ায় প্রচলিত ফলের মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা এখনো তৈরি হয়নি।
এ ছাড়া ফলটির সংরক্ষণকাল তুলনামূলক কম হওয়ায় সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারজাত করা প্রয়োজন। এতে কৃষকদের পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
তবে তাঁর মতে, প্যাশন ফলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা জুস ও পানীয় তৈরির শিল্পে। ফলটির স্বতন্ত্র স্বাদ, সুগন্ধ ও অম্লতা প্রক্রিয়াজাত পানীয় তৈরিতে কাজে লাগানো যায়। তাই শুধু তাজা ফল বিক্রির ওপর নির্ভর না করে জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার তৈরি করা গেলে চাষটি আরও লাভজনক হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কৃষক মো. সজল প্যাশন ফল চাষ করে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, কয়েক বছর আগে কক্সবাজারে ফলটি দেখে চাষের প্রতি আগ্রহী হন। পরে গত বছর ৩৩ শতক জমিতে প্যাশন ফলের চাষ শুরু করেন।
সজলের দাবি, জমি প্রস্তুত করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। প্রথম বছরেই ওই জমি থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন তিনি।
তিনি জানান, প্রতি দুই থেকে তিন দিন পরপর গড়ে এক হাজারটি ফল সংগ্রহ করেন। পাইকারেরা প্রতি পিস ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে ফল কিনছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফলটি শুধু ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও পাওয়া যায়।
সজল আরও জানান, অনলাইনে তাঁর চাষের খবর দেখে অনেকেই চারা সংগ্রহ করছেন। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত একটি খামারের ফলাফল; সব কৃষকের উৎপাদন খরচ ও লাভ একই রকম হবে, এমন নয়।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্যাশন ফলের রস, বীজ ও খোসা—তিনটি অংশই বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী। এ কারণে ফলটিকে ‘সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য ফল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ফলটির পুষ্টিগুণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব বাণিজ্যে রূপ দিতে হলে নিয়মিত বাজার সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্যাশন ফলের চাষ ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তুলনামূলক কম জমিতে চাষ করা সম্ভব হওয়ায় আগ্রহী কৃষকেরা পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারেন। তবে বিনিয়োগের আগে স্থানীয় বাজারে চাহিদা, বিক্রির সম্ভাব্য দাম, চারা ও পরিচর্যার খরচ এবং ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাজা ফলের বাজারের পাশাপাশি জুস ও পাল্প তৈরির শিল্প গড়ে উঠলে প্যাশন ফলের চাষ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে আনারকলি ফল বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন