বাগেরহাটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে একমাত্র নারী চিকিৎসক সাকিয়া হককে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরানোকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসক। তাঁর অভিযোগ, রোগীর সঙ্গে আসা কয়েকজন ব্যক্তি চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে তাঁকে গালাগাল করেন এবং মারতে তেড়ে আসেন।
সাকিয়া হক হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে তিনি রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে নিজের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
চিকিৎসক সাকিয়া হকের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাঁর দায়িত্ব ছিল। ওই সময়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তিনি জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যথা নিয়ে এক রোগী হাসপাতালে আসেন। প্রথমে রোগীর ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) করা হয়। পরীক্ষা, রক্তচাপ ও অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর তাৎক্ষণিকভাবে হৃদ্যন্ত্রের কোনো সমস্যা শনাক্ত হয়নি বলে জানান তিনি। পরে গ্যাসজনিত সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইনজেকশন দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরানোর চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসক। প্রথমবার চেষ্টা সফল না হলে একজন ওয়ার্ডবয় আবার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করেন সাকিয়া হক। পরে ক্যানুলা পরানোর বিষয়ে অভিজ্ঞ নার্সদের ডাকার জন্য হাসপাতালের কর্মীরা গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সাকিয়া হক অভিযোগ করেন, রোগীর সঙ্গে আসা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে গালাগাল শুরু করেন এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁকে সরাসরি শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়নি বলে জানান তিনি। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে শারীরিক হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীদের স্বজনেরা এগিয়ে আসেন। পরে হাসপাতালের কর্মীরা ওই ব্যক্তিদের চিকিৎসকের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।
ঘটনার পর রাত সোয়া ১টার দিকে ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন চিকিৎসক। সেখানে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি অভিযোগ করেননি। পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
চিকিৎসক সাকিয়া হক বলেন, রোগীকে ইনজেকশন দেওয়ার পর ২০ মিনিট পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ক্যানুলা পরানোর সময় একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এ সময় জরুরি বিভাগে মানুষের অতিরিক্ত ভিড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তাঁর ভাষ্য, রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের দাবি ছিল চিকিৎসককেই ক্যানুলা পরাতে হবে। কিন্তু একজন চিকিৎসকের পক্ষে একা সব কাজ সামলানো সম্ভব নয়। হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী নার্স ও ওয়ার্ডবয়দেরও এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে গালাগাল করা কিংবা মারতে তেড়ে আসা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলেও জানান সাকিয়া হক।
হাসপাতালের রেজিস্টারে রোগীর নাম শানু হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে আসা ওই ব্যক্তি বাগেরহাট জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ হানু।
২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি সরদার লিয়াকত আলীর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় শ্রমিক দল। ওই কমিটিতে আবু হানিফ হানু সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে কমিটিটি মাত্র পাঁচ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এরপর থেকে জেলায় শ্রমিক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাগেরহাট জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি সরদার লিয়াকত আলী বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকের সঙ্গে এমন আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানান।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মর্মাহত। কোনো হাসপাতালেই এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবলের এক-তৃতীয়াংশও নেই। সীমিত জনবল নিয়েই চিকিৎসক ও কর্মীরা রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও জানান, দুপুর পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায়নি। পরবর্তী সভায় ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তাঁর স্বজনদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন বলেন, পুলিশ এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পায়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রোগীদের নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। এ ঘটনায় অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন