অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
অনলাইন সংস্করণ

চিন্তার পরিবর্তন থেকে সমাজ গঠন: মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি মিশনের শিক্ষা

মদিনায় মসজিদে নববির দরজায় খোদাই করা ‌‌'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' (মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসূল।) `

ভূমিকা: সমাজ পরিবর্তনের শুরু মানুষের চিন্তায়

একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও টেকসই সমাজ গড়তে হলে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের জন্য মানুষের ভেতরে নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় চিন্তার পুনর্গঠন বা Cognitive Restructuring ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

সমাজবিজ্ঞানী পিটার বার্জার ও থমাস লাকম্যান তাঁদের The Social Construction of Reality গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সামাজিক চর্চা বাস্তবতার সামাজিক রূপ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতি মিশন ছিল মানুষের চিন্তা ও নৈতিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজকে নতুন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার এক ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা।

প্রায় ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে তিনি তৎকালীন আরব সমাজে তাওহিদ, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, ভ্রাতৃত্ব ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রচার করেন। আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র মানুষের বিশ্বাস ও আচরণে পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১. সমাজ বিনির্মাণে চিন্তার পুনর্গঠনের গুরুত্ব

মানুষের আচরণ অনেকাংশে তার চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়। অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করা, দুর্বলকে অবহেলা করা কিংবা গোত্র ও বংশের পরিচয়কে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করার মতো প্রবণতা সামাজিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে পারে। তাই সমাজ সংস্কারের জন্য বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রা‘দ, ১৩:১১)। আয়াতটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আত্মসংশোধনের গুরুত্ব তুলে ধরে।

বর্ণবাদ, স্বজনপ্রীতি ও লিঙ্গবৈষম্যের মতো সমস্যার মোকাবিলায় মানুষের মধ্যে সমতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মান গড়ে তোলা প্রয়োজন। মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে মানুষের বংশ ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করার শিক্ষা পাওয়া যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাকওয়া ও সৎকর্ম।

পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, একজন মানুষ নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অন্যের জন্যও তা পছন্দ করবে। সহিহ বুখারির ১৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত এই শিক্ষা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের কল্যাণ বিবেচনা করার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

২. চিন্তার পরিবর্তনে দাওয়াতি কাজের ভূমিকা

দাওয়াহ বা ইসলামের শিক্ষা প্রচারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করা। মানুষের পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক রীতি ও দীর্ঘদিনের বিশ্বাস তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে নতুন কোনো ধারণা গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আল-কুরআনের সূরা আন-নহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে প্রতিপালকের পথে আহ্বান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিতর্কের ক্ষেত্রেও উত্তম পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে সংযম, জ্ঞান, শ্রোতার প্রতি সম্মান এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার গুরুত্ব প্রকাশ করে।

মহানবী (সা.) মানুষের সামনে শুধু নৈতিক নির্দেশনা তুলে ধরেননি; বরং বিশ্বাস, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনে তার বাস্তব প্রয়োগও দেখিয়েছেন। ইসলামে আখিরাতের জবাবদিহির ধারণা মানুষকে এমন নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা কেবল বাহ্যিক নজরদারি বা শাস্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।

হাদিসে জিবরীলে বর্ণিত ইহসানের শিক্ষা এই আত্মসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, ইহসান হলো এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন মানুষ তাঁকে দেখছে; আর তা সম্ভব না হলে এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই উপলব্ধি ব্যক্তিকে একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে উৎসাহিত করে।

পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা বা Change Management ধারণার সঙ্গেও এই প্রক্রিয়ার কিছু তুলনা করা যায়। কুর্ট লিউইনের পরিবর্তন মডেলে পুরোনো অভ্যাস ও ধারণা পর্যালোচনা, নতুন আচরণ গ্রহণ এবং পরিবর্তনকে স্থায়ী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে দাওয়াতি কাজ মানুষের চিন্তা ও অভ্যাসে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

৩. মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি কৌশল ও সমাজ বিনির্মাণ

মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি মিশনে ধৈর্য, ধারাবাহিকতা, নৈতিক শিক্ষা এবং মানুষের বাস্তব অবস্থা বিবেচনার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁর নবুয়তি জীবনের মক্কি ও মাদানি পর্যায়ে দাওয়াতের ভিন্ন ভিন্ন দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মক্কি জীবন: বিশ্বাস ও নৈতিকতার ভিত্তি গঠন

নবুয়তের প্রথম ১৩ বছর মহানবী (সা.) মক্কায় তাওহিদ, আখিরাত, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি সুবিচারের শিক্ষা প্রচার করেন। সে সময় আরব সমাজে গোত্রকেন্দ্রিক আনুগত্য, সামাজিক মর্যাদার বৈষম্য এবং বিভিন্ন অন্যায় প্রথা প্রচলিত ছিল। তাঁর দাওয়াত মানুষের সামনে এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক মর্যাদার বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

গোত্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেওয়া তাঁর শিক্ষার অন্যতম দিক। সুনানে আবু দাউদের ৫১২১ নম্বর হাদিসে গোত্রবাদী আহ্বান ও গোত্রবাদের ভিত্তিতে লড়াইয়ের নিন্দা করা হয়েছে। এই শিক্ষা মানুষের পরিচয় ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে।

মাদানি জীবন: নৈতিক আদর্শের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

হিজরতের পর মদিনায় মুসলিম সমাজের সাংগঠনিক ও সামাজিক জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মদিনা সনদ বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে একটি চুক্তিভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনতে সহায়তা করে।

মদিনার সামাজিক ব্যবস্থায় পারস্পরিক সহযোগিতা, চুক্তি রক্ষা এবং সম্মিলিত দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আধুনিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ধারণার সঙ্গে এসব নীতির কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

ব্যক্তিভেদে দাওয়াত ও আচরণে সহমর্মিতা

মহানবী (সা.) মানুষের সঙ্গে আচরণে ধৈর্য ও কোমলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) দীর্ঘ সময় তাঁর সান্নিধ্যে থেকে তাঁর উত্তম আচরণের সাক্ষ্য দিয়েছেন। সহিহ বুখারির ৬০৩৮ নম্বর হাদিসে আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় তাঁর প্রতি মহানবী (সা.)-এর কোমল আচরণের কথা উঠে এসেছে।

তায়েফে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও সেখানকার মানুষের ধ্বংস কামনা না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের আশা প্রকাশ করার ঘটনা তাঁর ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। সহিহ বুখারির ৩২৩১ নম্বর হাদিসে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। প্রতিশোধের পরিবর্তে সংশোধন ও কল্যাণের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা এতে প্রতিফলিত হয়।

৪. চিন্তার পুনর্গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি মিশনের কেন্দ্রে ছিল আল-কুরআনের শিক্ষা। কুরআন মানুষকে অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি এবং সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহিত করে।

সূরা মুহাম্মদের ২৪ নম্বর আয়াতে কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা না করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবার সূরা আল-গাশিয়ার ১৭–১৮ নম্বর আয়াতে উটের সৃষ্টি এবং আকাশের গঠন নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব আয়াত মানুষের জ্ঞানচর্চা ও উপলব্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে।

সামাজিক মর্যাদা ও বৈষম্যের ক্ষেত্রেও কুরআনের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে পরিচিতির জন্য। আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে তাকওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিক্ষা জাতি, বংশ ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অহংকারের পরিবর্তে নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেয়।

ধাপে ধাপে পরিবর্তনের শিক্ষা

মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও সামাজিক রীতিতে পরিবর্তন আনতে সময় ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। কুরআনে মদ্যপানসংক্রান্ত বিধান পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটি এ বিষয়ে আলোচনায় প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।

প্রথমে সূরা আল-বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে মদ ও জুয়ার পাপ এবং উপকারের তুলনামূলক দিক তুলে ধরা হয়। পরে সূরা আন-নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়। সর্বশেষ সূরা আল-মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতে মদ ও জুয়াকে বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই ধারাবাহিকতা ইসলামের বিধান প্রবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি মানুষের অভ্যাস, উপলব্ধি ও আচরণে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শিক্ষা দেওয়ার তাৎপর্য আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

কুরআনের ভাষাশৈলী, অর্থবহ বক্তব্য ও নৈতিক আহ্বানও মানুষের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.)-এর বর্ণনায় সূরা আত-তূর তিলাওয়াত শুনে তাঁর মনে গভীর প্রভাব পড়ার ঘটনা সহিহ বুখারিতে উল্লেখ রয়েছে। এটি কুরআনের বক্তব্য মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধিতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

৫. মহানবী (সা.)-এর চরিত্র ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব

মানুষ কেবল বক্তব্য শুনে নয়, অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেও শেখে। এ কারণে নৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কথা ও কাজের সামঞ্জস্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর সততা, বিশ্বস্ততা, বিনয় ও ক্ষমাশীলতা তাঁর দাওয়াতি মিশনের গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম ভিত্তি ছিল।

সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা

নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ ও ‘আস-সাদিক’ নামে চিনত। সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আত্মীয়স্বজন ও মক্কাবাসীকে সতর্ক করার সময় তাঁর পূর্বপরিচিত সততা ও বিশ্বস্ততা আলোচনায় আসে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এ ঘটনা মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে।

যে ব্যক্তি নিজের আচরণে সততা বজায় রাখে, তার বক্তব্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। মহানবী (সা.)-এর জীবনে নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও দাওয়াতি কার্যক্রমের এই সম্পর্ক স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

ক্ষমাশীলতা ও সংশোধনের সুযোগ

মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতার বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও নির্যাতনের পরও প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও সাধারণ ক্ষমার দৃষ্টান্ত তাঁর নৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ক্ষমাশীলতা বিরোধ কমাতে, সম্পর্ক পুনর্গঠনে এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে। তবে ক্ষমার পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতি শিক্ষাকে সমাজে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিনয়, শ্রমের মর্যাদা ও মানবিক আচরণ

নেতৃত্বের মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও মহানবী (সা.) দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতেন এবং মানুষের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করতেন। সহিহ বুখারির ৬৭৬ নম্বর হাদিসে তাঁর ঘরের কাজে সহযোগিতা করার কথা বর্ণিত হয়েছে। মসজিদ নির্মাণ ও খন্দকের কাজে সাহাবিদের সঙ্গে অংশগ্রহণের ঘটনাও তাঁর শ্রমের মর্যাদা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত।

আধুনিক সামাজিক মনোবিজ্ঞানে Social Learning Theory বা সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বে পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ধারণার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মহানবী (সা.)-এর বাস্তব আচরণ তাঁর অনুসারীদের জন্য নৈতিক শিক্ষার একটি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।

আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর চরিত্রকে কুরআনের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ৭৪৬ নম্বর হাদিসে এ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তাঁর জীবনে শিক্ষা ও আচরণের সামঞ্জস্য নৈতিক আদর্শের বাস্তব প্রয়োগকে স্পষ্ট করে।

উপসংহার: বর্তমান সমাজেও প্রাসঙ্গিক মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতি মিশন থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক পরিবর্তনের জন্য মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও আচরণে ইতিবাচক রূপান্তর প্রয়োজন। কুরআনের শিক্ষা, প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াত, সততা, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার তাঁর সমাজ বিনির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি ও নৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকাশও জরুরি। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা মানুষকে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করতে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে এবং ন্যায় ও কল্যাণের পক্ষে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে।

তাঁর দাওয়াতি মিশনের মূল শিক্ষা হলো—সমাজকে উন্নত করতে হলে শুধু কাঠামো পরিবর্তন করলেই চলবে না; মানুষের মন ও চিন্তায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। এই নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে আজও তাৎপর্যপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপে অনিশ্চিত এদের মিলিতাও

1

মেসির ৭ মিনিটের ম্যাজিকে ইংল্যান্ডকে কাঁদিয়ে ফাইনালে আর্জেন্

2

নেইমারকে সম্মান জানাতে বিশেষ ম্যাচ আয়োজন করছে ব্রাজিল

3

এসএসসির ফল প্রকাশের তারিখ ঘোষণা

4

গোপালগঞ্জের গ্রামে মেসি–নেইমার ভাস্কর্য ও বিশাল পতাকায় বিশ্ব

5

‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখার মামলায় বাবা-ছেলে কারাগারে

6

বাংলা সিনেমার উন্নতি কেউ চায় না : শাকিব খান

7

পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

8

আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে চড়, ফিফার শাস্তির মুখে বেলিংহ্যাম

9

সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না হলে সুসম্পর্ক সম্ভব নয় ; রিজভী

10

মেসির রেকর্ড, আর্জেন্টিনার ইতিহাস লেখা অবিশ্বাস্য এক রাত

11

জামিন পেলেন আমির হামজা

12

দেশের ৩ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস

13

কথা কম বলে জবাবটা মাঠেই দিতে ভালোবাসি:রোমেরো

14

হরমুজ প্রণালিতে কড়া নিয়ন্ত্রণে ইরান

15

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তনু হত্যা মামলায় নতুন গতি

16

হজযাত্রীদের সেবায় নিবেদিত সৌদি যমজ বোন

17

খুনিদের ফাঁসি চাইলেন আবু সাঈদের দুই ভাই

18

শিক্ষকদের পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা চলছে: প্রতিমন্ত্রী

19

হেক্সা পূরণ করতে না পারায় ভক্তদের কাছে ক্ষমা চাইলেন ভিনিসিয়ু

20