ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মুসলমানদের জন্য এ দিনটি সাপ্তাহিক ইবাদত, আল্লাহর স্মরণ এবং আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে। পবিত্র কোরআনে ‘আল-জুমুআ’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা রয়েছে, যেখানে জুমার নামাজের আহ্বান শুনে আল্লাহর স্মরণে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! জুমার দিন যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সুরা আল-জুমুআ, আয়াত: ৯)
জুমার দিনে যেসব আমলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।
জুমার দিন ইসলামে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হাদিসে এ দিনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জুমার দিনের মর্যাদা এবং এ দিনে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ দিনে এমন একটি সময়ও রয়েছে, যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তিনি তা কবুল করেন—যদি দোয়াটি শরিয়তসম্মত হয়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৮৯৫)
তাই জুমার দিনকে অবহেলা না করে ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর স্মরণে কাটানোর চেষ্টা করা উচিত।
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো জুমার নামাজ আদায় করা। এ নামাজের আগে পবিত্রতা অর্জন, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা এবং মসজিদে গিয়ে মনোযোগের সঙ্গে খুতবা শোনা সুন্নাহসম্মত আমলের অন্তর্ভুক্ত।
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য পবিত্রতা অর্জন করে, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায়, মুসল্লিদের কষ্ট না দিয়ে নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবার সময় নীরব থাকে, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ ক্ষমা করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
আরেক হাদিসে এসেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা হয়—যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩)
জুমার দিন গোসল করা, শরীর ও পোশাক পরিষ্কার রাখা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহসম্মত আমল। এতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্য মুসল্লিদের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
আউস ইবনে আউস আস-সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিন গোসল করে দ্রুত মসজিদে যাওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। হাদিসে এ আমলের প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও রাতের নামাজের সওয়াবের কথা এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)
জুমার দিন আগে মসজিদে পৌঁছানো এবং ইমামের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম দিকে মসজিদে আগমনকারীদের জন্য উট, গরু, ভেড়া, মুরগি কোরবানি এবং ডিম দানের সওয়াবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪১)
তাই সম্ভব হলে সময় হাতে নিয়ে মসজিদে যাওয়া উচিত। খুতবার সময় কথা বলা, অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকা কিংবা অন্য মুসল্লিদের বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তা দান করেন। এ সময়টি কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। কিছু বর্ণনায় আসরের পরের সময়, বিশেষ করে আসরের শেষ সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে জুমার দিনের বিশেষ সময়ে দোয়া কবুলের কথা উল্লেখ রয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই জুমার দিনে বেশি বেশি দোয়া করা, নিজের ও পরিবারের কল্যাণ চাওয়া এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।
জুমার দিনের অন্যতম পরিচিত আমল হলো সুরা কাহাফ পাঠ করা। হাদিসে এ সূরা পাঠের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোয় উদ্ভাসিত হবে। (আল-মুস্তাদরাক, ২/৩৯৯; সহিহ তারগিব, হাদিস: ১৪৭৩)
তাই জুমার দিনে সুবিধামতো সময়ে সুরা কাহাফ পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
জুমার দিন ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ। এ দিনে পবিত্রতা অর্জন, যথাসময়ে মসজিদে যাওয়া, নামাজ আদায় এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
সহিহ বুখারির হাদিসে জুমার দিনের এসব আদব পালনের মাধ্যমে দুই জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
তবে এ ক্ষমার ফজিলতকে কবিরা গুনাহের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। বড় গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং কোনো গুনাহ হয়ে গেলে আন্তরিকভাবে তওবা করা জরুরি।
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন তোমাদের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি। এ দিনে তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, উম্মতের দরুদ তাঁর কাছে পেশ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
তাই জুমার দিনে কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা যেতে পারে।
জুমার দিন শুধু সাপ্তাহিক নামাজের দিন নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং নেক আমল বাড়ানোরও একটি সুযোগ। জুমার নামাজ আদায়, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, আগে মসজিদে যাওয়া, সুরা কাহাফ পাঠ, দোয়া ও দরুদ—এসব আমল আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার দিনের ফজিলত উপলব্ধি করে সহিহভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন