বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম-১৭-এর সাইডলাইনে পৃথক বৈঠক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী, কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী এবং সৌদি আরবভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা, এলএনজি আমদানি, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সৌদি আরবের বিদ্যুৎবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী নাসের আল-কাহতানির সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোক প্রকাশ করেন বাংলাদেশের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে হামলার নিন্দা জানিয়ে সৌদি সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি জানান তিনি।
এ সময় সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো শোকবার্তার বিষয়েও সৌদি মন্ত্রীকে অবহিত করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সৌদি সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের সহযোগিতা চান প্রতিমন্ত্রী। জবাবে সৌদি মন্ত্রী বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সৌদি আরবের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে সৌদি সরকারের সহযোগিতা আরও জোরদার করার আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সৌদি আরবের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করে।
কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী এবং কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা ও এলএনজি আমদানির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে বিদ্যমান এলএনজি আমদানি ব্যবস্থা পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। কাতারএনার্জির আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো এবং জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহপথ বহুমুখী করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি হলে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ পরিকল্পনা ও আমদানির ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দিনের তৃতীয় বৈঠকে সৌদি আরবভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এসিডব্লিউএ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সামির জে সেরহানের সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প উৎসের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা মিলতে পারে।
সৌদি আরব ও কাতারের সঙ্গে এসব বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এলএনজি সরবরাহের নতুন সুযোগ তৈরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে আলোচনার ফল বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, বিনিয়োগের শর্ত, প্রকল্পের অর্থায়ন এবং কারিগরি সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন