মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হুথিদের হামলার দাবি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে আক্রমণের খবর তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৩টা ১৯ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার্সের দাম ৫৫ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ দশমিক ১০ ডলারে দাঁড়ায়। আগের সেশনে দাম বেড়ে ১১০ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা গত ২০ মে-এর পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের নভেম্বর সরবরাহের চুক্তির দাম শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৯১ ডলারে দাঁড়ায়। মঙ্গলবার চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে, ডিসেম্বর সরবরাহের ডব্লিউটিআই চুক্তির দাম ৩৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তেলের দামে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে এ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে সময়ের সঙ্গে এই ঝুঁকির প্রভাব কমতে পারে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণে উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহনব্যবস্থার নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহের সময় ও ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা তেলের দামে প্রভাব ফেলছে।
সোমবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনায় একাধিক হামলা চালানোর দাবি করে। তাদের দাবির মধ্যে ছিল ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা, শাইবাহ তেলক্ষেত্র, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আবহা বিমানবন্দর।
তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এসব দাবি নিশ্চিত করেনি। রয়টার্সও স্বাধীনভাবে দাবিগুলো যাচাই করতে পারেনি।
এ ছাড়া ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণশিবিরে হুথিদের হামলায় ৫৮ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মজুত কমে থাকতে পারে বলে রয়টার্সের একটি প্রাথমিক জরিপে ধারণা দেওয়া হয়েছে। মজুত কমে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত হলে তা বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক শিথিল করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ৬৫ হাজার ব্যারেল বেড়ে ৮৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। তবে এক বছর আগের তুলনায় দেশটির উৎপাদন এখনো দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল কম।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনার চেয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোর আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তেল পরিবহনের ধারাবাহিকতা আপাতত বিশ্ববাজারে দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন