দুর্নীতির মামলার বিচার চলছে বছরের পর বছর। তবু কমছে না মামলার জট। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর হাজার হাজার মামলা এখনো বিচারাধীন। চলতি বছরের আগস্ট শেষে নিম্ন আদালতে দুই প্রতিষ্ঠানের মোট ৩ হাজার ৩৪৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪৭৩টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৮৪টি মামলা। একই সময়ে উচ্চ আদালতে দুদকের ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। মামলার দীর্ঘসূত্রতায় দুর্নীতির বিচার কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের গত আগস্ট পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার জট কমাতে বিশেষায়িত আদালত গঠন, উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং কমিশনের নিজস্ব দক্ষ ও স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলা জরুরি।
দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে কমিশনের দায়ের করা ৩ হাজার ১৯টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ঢাকায় ৮০৫টি এবং ঢাকার বাইরের আদালতগুলোতে বাকি মামলাগুলোর বিচার চলছিল। কমিশনের এসব মামলার মধ্যে ২ হাজার ৭১৫টির বিচার কার্যক্রম চলমান ছিল। আদালতের আদেশে স্থগিত ছিল ৩০৪টি মামলা।
অন্যদিকে, বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের ৩২৮টি মামলা এখনো বিচারাধীন। এর মধ্যে ১৫৯টির বিচার চলছে এবং ১৬৯টি মামলা স্থগিত রয়েছে।
দুদক ও বিলুপ্ত ব্যুরোর মামলা মিলিয়ে মোট বিচারাধীন ৩ হাজার ৩৪৭টির মধ্যে ২ হাজার ৮৭৪টির বিচার চলমান। বাকি ৪৭৩টি মামলা স্থগিত থাকায় সেগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এগোচ্ছে না। অর্থাৎ বিচারাধীন মামলার প্রায় ১৪ শতাংশ স্থগিত রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দুদক ও বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মোট ২৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৮টি মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে, ১৩২টিতে খালাস পেয়েছেন আসামিরা। বাকি ১৪টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
দুদকের ২৬২টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ১৩১টিতে সাজা, ১১৮টিতে খালাস এবং ১৩টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে বিলুপ্ত ব্যুরোর ২২টি মামলার মধ্যে সাতটিতে সাজা, ১৪টিতে খালাস এবং একটি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিচারাধীন মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তির এই সংখ্যা মামলার জট কমানোর চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। নতুন মামলা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরোনো মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করতে না পারলে সামগ্রিক জট কমানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমিশন ও বিলুপ্ত ব্যুরোর মোট ২৬৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ২৮৪টি মামলা, যা গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় ১৭টি বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালে বিচারিক আদালতে দুদকের ২৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ১৩৮টিতে সাজা, ১১৬টিতে খালাস এবং ৪১টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিল। ২০২৩ সালে কমিশনের ৩০৩টি এবং বিলুপ্ত ব্যুরোর ৩৮টিসহ মোট ৩৪১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়।
চলতি বছরের আট মাসে নিষ্পত্তির সংখ্যা গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও বিচারাধীন হাজার হাজার মামলার তুলনায় অগ্রগতি সীমিত। ফলে নিষ্পত্তির বর্তমান গতি দিয়ে সামগ্রিক মামলার জট কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সাবেক জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম মনে করেন, মামলার জট কমাতে দুদকের জন্য বিশেষায়িত বা এক্সক্লুসিভ আদালত গঠন করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কমিশনকে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
মঈদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৪ জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে মোট ৮৮টি আদালতে দুদকের মামলার বিচার হয়। তবে এসব আদালতে দুদকের মামলার পাশাপাশি অন্যান্য মামলাও পরিচালিত হয়। ফলে দুর্নীতির মামলাগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করার সুযোগ সীমিত থাকে। আসামিপক্ষ থেকেও কখনো কখনো বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, অন্তত আটটি বিভাগে একটি করে বিশেষায়িত আদালত গঠন করে সেখানে দুদকের মামলাগুলোর বিচার করা হলে নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো সম্ভব। এতে মামলাগুলো নির্দিষ্ট আদালতে বণ্টন করে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
দুদকের মামলায় দক্ষতা বাড়ানো এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপনের জন্য কমিশনের নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মঈদুল ইসলাম।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৩৩ ধারার আলোকে স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমিশনের নিজস্ব দক্ষ আইনজীবী তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, নিজস্ব বিশেষজ্ঞ আইনজীবী থাকলে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
বর্তমান আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
পুরোনো মামলার জটের পাশাপাশি নতুন মামলা ও অভিযোগপত্র দাখিলও আদালতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দুদকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কমিশন ৫৯৮টি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় আসামি করা হয় ২ হাজার ৮৭২ জনকে। একই বছরে ৪১৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
নতুন মামলার বিচার শুরুর পাশাপাশি আগের মামলাগুলোর কার্যক্রম চলতে থাকায় আদালতের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তদন্ত শেষ করা, অভিযোগপত্র দাখিল, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আসামিদের হাজিরাসহ বিভিন্ন ধাপ সময়মতো সম্পন্ন না হলে বিচার বিলম্বিত হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং আদালতে মামলার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একাধিক সভা হয়েছে। জনবল বাড়িয়ে অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গতি আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
দুদকের স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠন এবং বিশেষায়িত আদালতে দুর্নীতির মামলার বিচার পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, কমিশন বর্তমানে অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যমান জনবল কাঠামো অনুযায়ী জনবল দ্বিগুণ করার সুযোগ রয়েছে। জনবল কাঠামো পরিবর্তন করে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এতে মামলা, তদন্ত ও নিষ্পত্তির সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছে কমিশন।
নিম্ন আদালতের পাশাপাশি উচ্চ আদালতেও দুদকের বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগে ৪ হাজার ৬০৬টি এবং আপিল বিভাগে ২৪০টি—দুই বিভাগ মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল।
বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে রিট মামলা ১ হাজার ১১টি, ক্রিমিনাল মিস মামলা ১ হাজার ৩০৩টি, ক্রিমিনাল আপিল ১ হাজার ৩২৭টি এবং ক্রিমিনাল রিভিশন ১ হাজার ৩৬৫টি।
দুদকের পরিসংখ্যানে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে ২৭৯টি এবং আপিল বিভাগে ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মোট নিষ্পত্তির সংখ্যা ও বিভাগভিত্তিক হিসাবের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। প্রকাশের আগে এ সংখ্যাগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
সাবেক জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলামের মতে, উচ্চ আদালতে দুদকের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আপিল আদালত গঠন করা হলে বিচারাধীন মামলার জট কমানো সম্ভব হতে পারে।
দুর্নীতির মামলার দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষ প্রসিকিউশন গঠন এবং জনবল সংকট দূর করাকে তাই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন