২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করেছে সরকার। এই বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে সরকারকে। ফলে রাজস্ব প্রশাসনের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি নতুন অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের মধ্যে কর রাজস্ব থেকে আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে আসবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে কর-বহির্ভূত উৎস থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ে এবারও সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা থাকছে এনবিআরের ওপর। সংস্থাটির আওতায় সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে। এই খাত থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া আয়কর, মুনাফা ও মূলধনী মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ধীরে ধীরে আমদানি ও সম্পূরক শুল্কনির্ভরতা কমিয়ে আয়কর ও ভ্যাটভিত্তিক অভ্যন্তরীণ রাজস্ব কাঠামোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজস্ব ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জন এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। এজন্য করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এবং ১৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে স্পিকারের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটি প্রথম বাজেট, যা দেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন