বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ভারতের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটি সীমান্তের কাছাকাছি নতুন সেনাঘাঁটি ও সামরিক স্টেশন স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) কমান্ড সেন্টার, ড্রোন নজরদারি এবং বহুস্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে। এসব তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত।
প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সরু ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অঞ্চলটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে এসব স্থাপনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকৃত পরিধি এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে কোনো স্থাপনা আন্তর্জাতিক সীমান্তের খুব কাছে নির্মিত হলে তার অবস্থান, উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট চুক্তি সম্পর্কে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
নতুন সামরিক স্থাপনা নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায় কথিত ফরওয়ার্ড বেস। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘাঁটিটি বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তের বিপরীতে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত।
এ তথ্য সঠিক হলে ঘাঁটিটির অবস্থান, নির্মাণের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট সীমান্তবিষয়ক বিধিবিধান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, দূরত্ব ও কার্যক্রম সরকারি বা স্বাধীন নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি স্থাপনা নির্মাণ বা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশকে অবহিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, বাংলাদেশের উচিত এসব কার্যক্রম সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানো।
তিনি আরও বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশকে অবহিত না করে সীমান্তের কাছে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে থাকে, তাহলে বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে তোলা প্রয়োজন। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনার ক্ষেত্রে কী ধরনের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট চুক্তি, বিধি ও স্থাপনার প্রকৃতি বিবেচনায় যাচাই করতে হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ও ডেকান ক্রনিকলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পূর্বাঞ্চলে তিনটি সামরিক স্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেয়। এগুলো হলো আসামের ধুবড়ির বামুনি, বিহারের কিশানগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া।
লাচিত বরফুকন সামরিক স্টেশন, ধুবড়ি: আসামের ধুবড়ি জেলার বামুনিতে অবস্থিত এই স্থাপনাটি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর তেজপুরভিত্তিক চতুর্থ কোরের অধীন এবং এখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ সেনা রাখার সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
চোপড়া ফরওয়ার্ড বেস, উত্তর দিনাজপুর: ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্তের বিপরীতে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরে। শিলিগুড়ি করিডোরের কাছে এর অবস্থান হওয়ায় সামরিক ও যোগাযোগগত দিক থেকে এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
কিশানগঞ্জ ফরওয়ার্ড বেস, বিহার: শিলিগুড়ি করিডোরের দক্ষিণ প্রান্তের কাছে অবস্থিত এই স্থাপনাটি দ্রুত সেনা মোতায়েন ও রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর সি তিওয়ারি চোপড়া ঘাঁটি পরিদর্শন করেন এবং ধুবড়ির সামরিক স্টেশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার রঞ্জিত কুমার বরঠাকুর পিটিআইকে জানান, ধুবড়ির স্টেশন মানব ও সংকেতভিত্তিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
এদিকে, জি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লাংলাই জেলার পারভা গ্রামের কাছে আরও একটি সামরিক স্থাপনা নির্মাণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। এলাকাটির কাছাকাছি ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত মিলিত হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে পরিকল্পনাটির চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পর্কে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তসহ বিভিন্ন সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া তাপীয় ও ইনফ্রারেড প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন, ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিক সেন্সর, ইনফ্রারেড লেজারভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় মানুষের চলাচল, সন্দেহজনক কার্যক্রম ও ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তবে বাংলাদেশ সীমান্তের কতটা অংশে এসব ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, কোন প্রযুক্তি কী পরিমাণে চালু রয়েছে এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত ২৬ মে রাজস্থানের বিকানের সীমান্ত পরিদর্শনের সময় অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়ে বক্তব্য দেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সীমান্তে ‘স্মার্ট বর্ডার প্রজেক্ট’ সম্প্রসারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর প্রায় ৩ হাজার ২৪০ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। তবে সীমান্তের বিভিন্ন অংশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক নয়। ফলে কোনো প্রযুক্তি কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পূর্বাঞ্চলে ভারতের বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন রয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বজায় রেখেছে ভারতীয় বিমানবাহিনী।
ফার্স্টপোস্টের প্রতিবেদনে শিলিগুড়ি করিডোরের আশপাশে রুশ নির্মিত এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ, ভারত-ইসরায়েল যৌথভাবে তৈরি মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
তবে নির্দিষ্ট কোন স্থানে কোন ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে, সেগুলোর কার্যকর পাল্লা কতটুকু এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ সামরিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
চলতি বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত একটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে শিলিগুড়ি করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে ভূগর্ভস্থ গোলাবারুদ মজুদাগার ও রকেট উৎক্ষেপণের জন্য একাধিক অবস্থান তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে গুয়াহাটিতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বড় এয়ার শোতে রাফাল, সুখোই ও মিরাজ যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এ ধরনের আয়োজনকে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে দেখলেও এর নির্দিষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ড্রোনের উপস্থিতি নিয়ে আগেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ মে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের মোগলবাড়ী সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের একটি ড্রোন বাংলাদেশের ভেতরে পড়ে যায়।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ড্রোনটি ৮৪১ নম্বর প্রধান সীমান্ত পিলারের কাছে শূন্যরেখা থেকে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ গজ ভেতরে পাওয়া যায়। বিএসএফের দাবি ছিল, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। সে সময় তিস্তা ব্যাটালিয়নের ৬১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফজলে মুনিম জানিয়েছিলেন, ড্রোনটি বিজিবির হেফাজতে রয়েছে এবং বিএসএফ সেটি ফেরত চেয়েছে।
ঘটনার পর সীমান্তে টহল জোরদার করা হলে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে কুড়িগ্রামের রৌমারীর বড়াইবাড়ী সীমান্তেও উত্তেজনার সময় বিএসএফের ড্রোন ওড়ানোর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
সীমান্ত এলাকায় ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ বা অননুমোদিত কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। এ ধরনের ঘটনার দ্রুত তদন্ত, তথ্য বিনিময় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশও সীমান্ত নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিজস্ব অর্থায়নে পাঁচটি মাঝারি পাল্লার ড্রোন, ৫০টি স্বল্প পাল্লার ড্রোন, ৮২টি নজরদারি ড্রোন এবং ১০টি হ্যান্ডহেল্ড অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা যুক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এসব প্রযুক্তি দুর্গম ও বনাঞ্চলঘেরা সীমান্তে নিরাপত্তা এবং নজরদারি বাড়াতে সহায়তা করবে। ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিজিবি একটি প্রশিক্ষণ স্কুলও চালু করেছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যকর করতে শুধু সরঞ্জাম কেনাই যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষিত জনবল, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ও জরুরি।
ভারত সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক রাখা প্রয়োজন। বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক দলজিৎ সিং চৌধুরীও একসময় সীমান্ত পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে বর্ণনা করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবনের বিষয়টিকেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রতিবেদন থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে ভারতের সামরিক স্থাপনাগুলো কেবল বাংলাদেশকে লক্ষ্য করেই নির্মিত হচ্ছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব, চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাসহ একাধিক বিষয় ভারতের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ভারতের সামরিক স্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর খবরের বিষয়ে বিজিবির কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বিজিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে।
সীমান্তের দুই পাশে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমান্তের অবস্থান, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো স্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে তথ্য যাচাই, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীমান্তের কাছে ভারতের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, স্থাপনাগুলোর প্রকৃত অবস্থান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপই হতে পারে কার্যকর পথ।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনটি ঘাঁটি চালুর তথ্য, চোপড়া ঘাঁটির সীমান্ত থেকে দূরত্ব, মিজোরামের প্রস্তাবিত ঘাঁটি, এস-৪০০ ও অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং বিজিবির ড্রোনসংক্রান্ত সংখ্যাগুলো মূল সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে উদ্ধৃত বক্তব্যটিও সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও বিধির আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন