অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ এএম
অনলাইন সংস্করণ

মাছ কম, তবু ঠাকুরগাঁওয়ের বুড়ির বাঁধে উৎসবের কমতি নেই

জালে মাছ কম, তবু উৎসবের কমতি নেই

একবার, দুবার, তিনবার—এভাবে পরপর চারবার জাল ফেলেও মাছের দেখা পেলেন না পরিমল রায়। প্রতিবারই খালি জাল তুলে হতাশ হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার কার্তিকতলা গ্রামের এই বাসিন্দা। পাশে থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন রায় তখন সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘জাল ফেলেক, এইবার বড় একখান মাছ উঠিবে।’

বন্ধুর কথায় শেষবারের মতো জাল ফেললেন পরিমল। ঝপাৎ করে পানিতে ডুবে যাওয়া জালটি টেনে তুলতেই দেখা গেল, তাতে আটকে আছে দুটি পুঁটি মাছ। ছোট্ট এই প্রাপ্তিতেই মুখে হাসি ফুটল তাঁর।

মাছ মিলুক বা না মিলুক, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সুক নদের ওপরের বুড়ির বাঁধে মাছ ধরার আনন্দ শুধু মাছ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধু-স্বজন নিয়ে দলবেঁধে মাছ ধরা, খুনসুটি, জাল ফেলা আর মাছ ওঠার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে এটি স্থানীয় মানুষের কাছে এক আনন্দের উৎসব।

গত শুক্রবার রাতেও চারপাশে অন্ধকার ছিল। আবছায়ার মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে ভেসে আসছিল জাল পানিতে পড়ার ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ। একটু একটু করে পূর্ব আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়তেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সেই ব্যস্ততা। বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে কিংবা কোমরসমান পানিতে নেমে নানা বয়সী মানুষ জাল ফেলছিলেন। অধিকাংশের জালই ছিল ফাঁকা, কিন্তু তাতে কারও উৎসাহে ভাটা পড়েনি।

সেচের বাঁধে মাছ ধরার উৎসব

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঠাকুরগাঁও কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সম্পূরক সেচের সুবিধা দিতে সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের সীমানায় ১৯৫১-৫২ অর্থবছরে বুড়ির বাঁধ সেচ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বাঁধের পানি ধরে রেখে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়াই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য।

পরে ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে নির্মাণ করা হয় ১১ দশমিক ৩০ কিলোমিটার সেচখাল। এর মাধ্যমে বর্তমানে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাঁধের পানিতে প্রতিবছর বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য বিভাগ। বুড়ির বাঁধ পানি ব্যবস্থাপনা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে এসব মাছের দেখভাল করা হয়। প্রতিবছর অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে বাঁধের পানি ছেড়ে মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপরই আশপাশের গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে শুরু হয় মাছ ধরার উৎসব।

জলকপাট নির্মাণের পর থেকেই এই রেওয়াজ চলে আসছে। সাধারণত বিকেলের দিকে ঘোষণা দিয়ে বাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। পানি কমে এলে ভোর থেকে আশপাশের গ্রামের মানুষ ফিকা জাল ও খইয়া জাল নিয়ে মাছ ধরতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন অন্যান্য এলাকার এমনকি পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষও।

গতকাল শনিবার ভোরে সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পানি থেকে জাল টেনে তুলে দু-একটি ছোট মাছ হাতে নিয়ে ফিরছেন কেউ কেউ। আবার কেউ নতুন করে জাল সাজিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়ও। কেউ কয়েকটি পুঁটি মাছ পেয়ে খুশি, কেউ বড় মাছের আশায় বারবার জাল ফেলছেন। মাছ কম উঠলেও আনন্দে ঘাটতি নেই।

মাছের আশায় রাতভর জাল ফেলেন তাঁরা

চার বন্ধু মিলে গত শুক্রবার রাতে বাঁধে মাছ ধরতে আসেন সদর উপজেলার পূর্ব বেগুনবাড়ি গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৩৫)। পালা করে জাল ফেলতে ফেলতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। বিশ্রামের ফাঁকে আনোয়ার বলেন, ‘চার-পাঁচ বছর ধরে এই বাঁধে মাছ ধরতে আসি। হইহুল্লোড় করে দিন কেটে যায়। কোনো বছরই আশানুরূপ মাছ পাই না। তবু আসি। এখানে এলে সবার সঙ্গে দেখা হয়, আনন্দ করা যায়।’

বাঁধের হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক জাল ফেলছিলেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকার তপন রায় (২৯)। তিন ঘণ্টা জাল ফেলেও তাঁর ভাগ্যে জুটেছিল আধা কেজির মতো ছোট মাছ। তাতেই খুশি তিনি।

মাছ ধরতে আসার কারণ জানতে চাইলে তপন বলেন, ‘এইঠে খালি কী মাছ মারিবা আইচ্ছু? আনন্দও-তো হচে।’

জাল ফেলতে ফেলতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা গ্রামের জয়ন্ত বর্মন (৪৭)। একসময় হাতের জাল রেখে গান ধরেন তিনি—

‘সারা দিন ধাপ ঠেলিয়ে
হলাম কেবল বলসারা
কই হল মোর মাছ ধরা।’

তাঁর সঙ্গে সুর মেলান অন্যরাও। গান থামিয়ে জয়ন্ত বলেন, আর মাছ ধরা হবে না, এবার বাড়ি ফিরতে হবে। তবে ফেরার আগে কিছু মাছ কিনে নিতে হবে।

কেন মাছ কিনতে হবে, তার ব্যাখ্যাও দিলেন জয়ন্ত। প্যারোডির সুরে বললেন, ‘বউ আমার ভাত খাবার চাইছে পুঁটি দিয়া/ কই হল মোর মাছ ধরা/ ফাটি যায় হিয়া।’

এরপর তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী পুঁটি মাছের ঝোল রান্নার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু নিজে মাছ না পাওয়ায় বাড়ি ফেরার আগে বাজার থেকে কিছু মাছ কিনে নিতে হবে।

বড় মাছ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ইয়াসিন

অনেকের জালে যখন তেমন মাছ উঠছিল না, তখন রুহিয়া উপজেলার রামনাথ এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আলীর জালে উঠে আসে একটি ‘জাপানি রুই’। মাছটির ওজন এক কেজির বেশি হবে বলে ধারণা করা হয়।

এমন মাছ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ইয়াসিন বলেন, ‘অনেকেই তেমন মাছ পায়নি। এত বড় মাছ পেয়ে আমি খুবই খুশি।’

ছোট মাছের অল্প প্রাপ্তি কিংবা বড় মাছ পাওয়ার আনন্দ—দুইয়ের মধ্য দিয়েই বুড়ির বাঁধে মাছ ধরার উৎসবের প্রাণবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে।

মাছ কমেছে, বেড়েছে মানুষের ভিড়

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় বুড়ির বাঁধে রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি, শোল, ট্যাংরা ও খলসেসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বছর বছর মাছ ধরতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়লেও জালে আগের মতো মাছ উঠছে না।

একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমজান আলী (৫৬) বলেন, মাছ ধরতে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, কিন্তু মাছের প্রাপ্তি কমেছে। তাঁর সঙ্গে একমত আখানগর এলাকার রমণী কান্ত রায় (৬৩)। তিনি বলেন, ‘আগতে জাল ফেললেই কত মাছ জালত উঠিলহে। কিন্তু অ্যালা মাছই নাই।’

রমণী কান্তের অভিযোগ, এলাকার বিভিন্ন স্থানে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখার কারণে মাছ আটকে যাচ্ছে। ফলে মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা।

মাছ ধরার উৎসব ঘিরে বাঁধের ওপর বসেছে অস্থায়ী বাজার। খাবারের হোটেল, ফল, খেলনা ও প্রসাধনীর দোকান নিয়ে জমে উঠেছে বেচাকেনা। বাইরের এলাকা থেকে আসা মানুষের মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল রাখার জন্য তৈরি হয়েছে অস্থায়ী গ্যারেজ। পাশাপাশি বাঁধের ওপর পসরা সাজিয়ে বসেছেন মাছ ব্যবসায়ীরা। কেউ মাছ ধরছেন, কেউ আবার বাজার থেকে মাছ কিনে বাড়ি ফিরছেন।

কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে

ঠাকুরগাঁও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, প্রতিবছর বুড়ির বাঁধের পানিতে কমবেশি মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পরে মাছ ধরার জন্য বাঁধ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় মাছ ধরাকে ঘিরে উৎসব জমে ওঠে। এবারও মাছ ধরতে কয়েক শ মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছেন।

বাঁধের পানিতে কারেন্ট জাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছি।’

পাউবোর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিবছর বাঁধের কপাট খুলে দেওয়া হয়। সে সময় এলাকাটি মিলনমেলায় পরিণত হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষক ও লেখক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, প্রতিবছর বুড়ির বাঁধে মাছ ধরার উৎসব হয় এবং তিনি নিজেও তা উপভোগ করেন। তাঁর মতে, এই উৎসব শুধু মাছ ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ভাগাভাগি করারও একটি উপলক্ষ।

জালে মাছ উঠুক বা না উঠুক, বুড়ির বাঁধে মানুষের এই মিলনমেলা প্রমাণ করে—গ্রামীণ জীবনের অনেক আনন্দের মূল্য মাছের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। বন্ধুত্ব, আড্ডা, গান আর একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দই এই উৎসবকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চা শিল্পের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উৎপাদন ও রপ্তানি ব

1

চোখের জলে বিশ্বমঞ্চকে রোনালদোর বিদায়

2

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে চোরাচালান রোধে বিজিবির তৎপরতা জ

3

এবার সৌদিকে রুখে ইতিহাস গড়ে নকআউটে কেপ ভার্দে

4

ট্রাইবেকারের প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামছে ব্রাজিল

5

হাম ও উপসর্গ নিয়ে দুই মাসে মৃত্যু ৪৫৩

6

সারা দেশে বাড়তে পারে তাপমাত্রা, বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

7

সেরাদের পতন হলেই মধ্যপন্থিরা আনন্দ করে-মার্টিনেজ

8

মেসি-ইয়ামালের আলিঙ্গনে ফুটবল দেখল প্রজন্ম বদলের ছবি

9

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আসিয়ানের সক্রিয় ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

10

মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে বিশেষজ্ঞদের যেসব পরামর্শ

11

ইকুয়েডরকে বিদায় করে ৪০ বছরের নকআউট অভিশাপ ঘুচাল মেক্সিকো

12

পোল্যান্ডে ৫ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প

13

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করল জামায়াত

14

এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক কারাগারে

15

মা মানেই নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব, ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অনন্ত গ

16

নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিচ্ছেন না জেডি ভ্যান্স

17

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

18

ইংল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনা কেন নীল জার্সি পরতে চায়?

19

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তায় থাকা ২ ট্যাংকারে ইরানের হাম

20