মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি বিদেশি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার থাকার অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন সাময়িকী ভ্যানিটি ফেয়ার-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে। তবে কুশনার ও তাঁর আইনজীবী অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানী সাংবাদিক ম্যাথিউ কোলের আসন্ন বই প্রিন্সেস অ্যান্ড থিভস: জ্যারেড কুশনার অ্যান্ড মোহাম্মদ বিন জায়েদের সিক্রেট প্লট টু রিমেক দ্য মিডল ইস্ট থেকে নেওয়া অংশের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেদারল্যান্ডসের গোয়েন্দারা কুশনারের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে তথ্য পান। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যাংক হিসাব এবং সম্ভাব্য আর্থিক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালত বা কোনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডাচ গোয়েন্দারা কুশনারের আইফোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পান। ওই হিসাবে আজারবাইজানের একটি ব্যাংক থেকে কয়েক শ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকে ওয়াতানি আল এমারাত ফাউন্ডেশনের নামে থাকা একটি হিসাবে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এই সংস্থার ব্যাংক হিসাবে কুশনারের লেনদেন পরিচালনার অনুমতি ছিল বলে দাবি করেছেন লেখক। তবে হিসাবটির মালিক তিনি ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাবটির সঙ্গে আমিরাতের প্রভাবশালী কর্মকর্তা তাহনুন বিন জায়েদের সংশ্লিষ্টতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে লেখক দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিতে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে একটি গোপন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার রেখেছিলেন।
এর মধ্যে একটি হিসাবে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্য একটি হিসাবে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের অভিযোগ তোলা হয়েছে। দ্বিতীয় হিসাবটি ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংক ব্যবস্থার অংশ ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
লেখকের অভিযোগ, এসব অর্থের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবহারের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। অন্য হিসাবটির অর্থ কুশনারের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে উত্থাপিত দাবিগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জ্যারেড কুশনার অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, লেখক এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
কুশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের সমর্থনে কোনো ব্যাংক বিবরণী, অর্থ স্থানান্তরের নথি, হিসাব নম্বর কিংবা লেনদেনের নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁকে গণমাধ্যমের ব্যাপক অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তখনও এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কুশনারের বক্তব্য, ঘটনাগুলো কখনো ঘটেনি বলেই সে সময় এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
কুশনারের আইনজীবী চ্যাড মিজেলও অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, বিষয়টি শুধু ঘটনার ব্যাখ্যা বা স্মৃতির পার্থক্য নয়; অভিযোগে উল্লেখ করা ব্যাংক হিসাবগুলোরই অস্তিত্ব নেই।
আইনজীবী আরও বলেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে গুরুতর ও মানহানিকর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে সব ধরনের আইনি সুযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদনে কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের যে দাবি তোলা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রতিবেদনে গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কুশনার ও তাঁর আইনজীবী অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত বা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন না করে, প্রতিবেদনে উত্থাপিত দাবি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা জরুরি।
মন্তব্য করুন