ওয়ানডে ক্রিকেটে একসময় দলীয় ৪০০ রান ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য এক মাইলফলক। এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। ব্যাটিংয়ের আগ্রাসী ধরন, দ্রুত রান তোলার কৌশল এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রভাব ওয়ানডেতেও বড় সংগ্রহের প্রবণতা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একাধিক দল চার শ রানের গণ্ডি পেরিয়েছে, এমনকি সেই রান তাড়া করে জয়ের নজিরও তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই চার শ রানের দুনিয়ায় বাংলাদেশ কোথায়? আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে এখনো দলীয় ৪০০ রানের দেখা পায়নি টাইগাররা। এমনকি নিজেদের সর্বোচ্চ সংগ্রহও ৩৫০ রানের নিচে। অথচ ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে বাংলাদেশের দল চার শ রানের ঘর পেরিয়েছে।
১৯৯৬ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা কেনিয়ার বিপক্ষে ৫ উইকেটে ৩৯৮ রান তুলে ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। সেই সময় দলীয় ৪০০ রান ছিল প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরে ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক ম্যাচে ওয়ানডে ক্রিকেটের রান তোলার ধারণা আমূল বদলে যায়।
সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেটে ৪৩৪ রান করেছিল। জবাবে ৯ বল হাতে রেখে ১ উইকেটে ৪৩৮ রান তুলে জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে জয়ের এই ম্যাচ এখনো ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা।
এরপর ভারত, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দল একাধিকবার চার শ রানের মাইলফলক ছুঁয়েছে। বড় সংগ্রহ এখন ওয়ানডে ক্রিকেটের পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দলীয় ৪০০ রান করার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান শীর্ষে। ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাও এই তালিকায় এগিয়ে রয়েছে। শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দলও একাধিকবার চার শ রানের গণ্ডি পেরিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য হতাশার বিষয় হলো, টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত কয়েকটি দলের সঙ্গে এখনো আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৪০০ রান করার তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি টাইগাররা। এই তালিকায় পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ৬ উইকেটে ৩৪৯ রান। ২০২৩ সালে সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এই রান করেছিল বাংলাদেশ।
অর্থাৎ, চার শ রানের মাইলফলক ছুঁতে হলে নিজেদের সর্বোচ্চ সংগ্রহের চেয়ে আরও ৫১ রান বেশি করতে হবে টাইগারদের। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এই ব্যবধান অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য বড় জুটি, কার্যকর পাওয়ারপ্লে এবং ইনিংসের শেষ দিকে দ্রুত রান তোলার সামর্থ্য প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে বাংলাদেশ চার শ রান করতে না পারলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে এই মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে মোহামেডান আবাহনীর বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৪০৬ রান করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি দেখায়, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেও বড় সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঘরোয়া প্রতিযোগিতার রেকর্ড আর আন্তর্জাতিক ওয়ানডের রেকর্ড এক নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একই সাফল্য পেতে হলে প্রতিপক্ষের মান, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং চাপ সামলানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ানডেতে শুধু চার শ রান করাই নয়, সেই লক্ষ্য তাড়া করে জেতার ঘটনাও ঘটেছে। ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৩৪ রান তাড়া করে জয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
এ ছাড়া শ্রীলঙ্কাও বড় লক্ষ্য তাড়া করে একাধিক স্মরণীয় জয় পেয়েছে। ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও চার শ রানের বেশি লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের নজির রয়েছে। এসব ফলাফল প্রমাণ করে, আধুনিক ক্রিকেটে বড় সংগ্রহ মানেই নিশ্চিত জয় নয়।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দলীয় ৫০০ রানও আর কল্পনার বিষয় নয়। ভারতের বিজয় হাজারে ট্রফিতে তামিলনাড়ু ২০২২ সালে অরুণাচল প্রদেশের বিপক্ষে ২ উইকেটে ৫০৬ রান করেছিল। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিহার একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৬ উইকেটে ৫৭৪ রান তোলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড ইংল্যান্ডের। ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৪৯৮ রান করেছিল ইংলিশরা।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে চার শ রান করতে হলে শুধু একজন ব্যাটারের বড় ইনিংস যথেষ্ট নয়। টপ অর্ডারের শক্ত ভিত, মাঝের ওভারে উইকেট ধরে রাখা এবং শেষ ১০ ওভারে দ্রুত রান তোলার সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশ্ব ক্রিকেটে চার শ রান এখন আর বিরল কোনো ঘটনা নয়। তাই বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জটি অসম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, কবে সেই সামর্থ্যকে আন্তর্জাতিক ওয়ানডের স্কোরবোর্ডে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে টাইগাররা?
মন্তব্য করুন